উদ্বিগ্ন জয়পুরহাটের কৃষক
ধাক্কা সামলে আলুর বাম্পার ফলন, বাজারে হতাশ চাষি
প্রতিমণ আলুর দাম নেমেছে ২৮০ টাকায়
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার সড়াইল মাঠে আলু তুলছেন স্থানীয় নারী শ্রমিকরা। শনিবার তোলা ছবি সমকাল
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত বছরের নভেম্বর মাসে আকস্মিক মৌসুমি হাওয়ার দিক বদল আর ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গত বছরের অকাল বৃষ্টি কৃষিতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা সৃষ্টি করে। এই বৃষ্টির কারণে জয়পুরহাটসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। শেষ পর্যন্ত সে ধাক্কা সামলে আলু উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের তথ্য জানিয়েছে কৃষি অধিদপ্তর।
এদিকে ফলনের চ্যালেঞ্জ উতরে এসে এবার বাজারে আলুর দরপতনের মুখে পড়েছেন জয়পুরহাটের আলুচাষিরা। আলুর যে দাম তাতে, উৎপাদন ব্যয় ওঠার সম্ভাবনা নেই বলে হতাশা প্রকাশ করেছেন একাধিক কৃষক।
রমজানের শুরু থেকে জয়পুরহাটের মাঠে মাঠে আলু তোলার ধুম পড়েছে। প্রতি শতকে বিভিন্ন জাতের আলু চার থেকে সাড়ে চার মণ ফলন হচ্ছে। বাজারে আলুর দাম না থাকায় কৃষকদের চোখেমুখে চিন্তার ভাঁজ দেখা যাচ্ছে। ফলন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পেয়ে দিশেহারা তারা।
স্থানীয় চাষিরা বলছেন, দিন যত যাচ্ছে, বাজারে আলুর দর আরও কমছে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ দূরের কথা, বিঘাপ্রতি বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। ফলন ভালো হলেও দামের এই অস্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তিত কৃষি বিভাগও।
শনিবার সকালে জেলার একাধিক স্থানে আলুর মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বয়স হওয়ায় চাষিরা আলু তুলছেন কিন্তু দাম কম হওয়ায় বিক্রি না করে কা রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখছেন। বিক্রির করতে গেলেই তাদের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে। কৃষকদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষে সার, বীজ, সেচ, নিড়ানি, ও শ্রমিক খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বর্তমানে যে বাজারদর তাতে প্রতি বিঘার আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫-১৬ হাজার টাকা। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকার।
স্থানীয় বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে সাদা জাতের ডায়মন্ড আলু এবং লাল স্টিক জাতের আলু প্রতি মণ (৪০ কেজি) ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর গ্যানোলা জাতের আলু বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়। সিন্ডিকেট নাকি চাহিদার অভাব, ঠিক কোন কারণে আলুর বাজারে এই ধস, তা নির্ধারণ করা যায়নি এখনও। এ নিয়ে কৃষকদের মনে জন্ম নিয়েছে তীব্র ক্ষোভ।
চাষিরা বলছেন, সরকারিভাবে আলু রপ্তানি করা গেলে এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো না তাদের। জেলার কালাই উপজেলার সড়াইল মাঠে নারী শ্রমিকদের নিয়ে আলু তুলছেন কৃষক সাখাওয়াত হোসেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও এক মণ আলু ৬০০ টাকায় বিক্রি করেছি। সেই আলু ২৫০ থেকে ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এখন আলুর দাম বেশি হওয়ার কথা। কারণ হিমাগারগুলো আলু নিচ্ছে। সে হিসাবে দাম বাড়ার কথা।
আরেক কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন, ‘বর্তমান সরকারকে তাদের মতো চাষিদের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের কাজ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে কোনো মৌসুমে ফসলহানিতে বাজারের পতন ঘটলে যাতে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
সবজি রপ্তানিকারক আব্দুল বাসেদ বলেন, বিগত বছরগুলোতে প্রচুর পরিমাণ আলু রপ্তানি করা হলেও এবার শুরুই হয়নি। অন্য সবজির তুলনায় আলুর চাহিদা কম থাকায় রপ্তানি কম। গত দুই
বছর আগে আলু রপ্তানিতে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হলেও এবার তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি শামস মতিন বলেন, সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করে, তবে এখানে অনেক উদ্যোক্তা গড়ে উঠবে। এতে আলু বিদেশে রপ্তানি করা সহজ হবে এবং কৃষকরাও লোকসানের হাত থেকে বাঁচবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, এবার জেলায় ৩৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। জেলায় যদি আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যায়, তাহলে আলুর জন্য নতুন স্থানীয় বাজার ও কর্মসংস্থান হবে।
- বিষয় :
- আলু
