মা লড়ছেন এক হাসপাতালে, অন্য হাসপাতালে সন্তানের লাশ
রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
রামগড় (খাগড়াছড়ি) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৩:৫৭
মা রোকসানা আক্তার (১৮) তখনও অস্ত্রোপচার কক্ষের টেবিলে সংজ্ঞাহীন। ফলে জানার সুযোগ ছিল না, তাঁর কোল আলো করে আসা নাড়িছেঁড়া ধন কোথায়। তাঁর নবজাতক সন্তান তখন ১০০ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনআইসিইউতে। যখন মায়ের জ্ঞান ফিরল, তখন তিনি পেলেন সন্তানের মৃত্যুর খবর।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি অসাধু চক্রের ‘রেফার বাণিজ্যের’ কারণে সঠিক সময়ে সিজারিয়ান অপারেশন না হওয়ায় এভাবেই পৃথিবীর আলো দেখার তিন দিনের মাথায় না ফেরার দেশে চলে গেল রোকসানা-রমজান দম্পতির প্রথম সন্তান। শনিবার সকালে পৌরসভার নাকাপায় নিজেদের বাড়িতে যখন শিশুটিকে দাফন করা হচ্ছিল, তখনও মা রোকসানা স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
১৯৯৬ সালে রামগড় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স স্থাপিত হওয়ার দীর্ঘ ২৮ বছর পর ২০২৪ সালের ৬ জুলাই ঘটা করে সিজারিয়ান সেবা (ওটি) চালু হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই অজ্ঞাত কারণে সেই সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ উঠেছে, বারইয়ারহাট ও ফেনীর বেসরকারি ক্লিনিকগুলো থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হাসপাতালের একটি চক্র ওটি সেবাটি অঘোষিতভাবে বন্ধ করে রেখেছে। আর ক্ষতির শিকার হলেন রোকসানা।
ভুক্তভোগী রমজান আলী জানান, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে রামগড় পৌরসভার চৌধুরীপাড়ার রমজান আলীর স্ত্রী রোকসানাকে হাসপাতালে আনা হলে ‘নরমাল ডেলিভারি’র নামে পরের দিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত কালক্ষেপণ করেন দায়িত্বরতরা। প্রসূতির অবস্থা সংকটাপন্ন হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দায়মুক্তির কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তাঁকে ফেনী বা বারইয়ারহাটে দ্রুত নিয়ে যেতে বলা হয়। অন্যত্র রেফার্ড করে। অসহায় স্বামী রমজান আলী ও তাঁর স্বজনরা কোনো কুলকিনারা না পেয়ে রোকসানা ও অনাগত সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে একটি প্রাইভেট হাসপাতালের দ্বারস্থ হন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে উল্লেখ করে রোগী ভর্তিতে অনীহা প্রকাশের পর অন্তত প্রসূতিকে বাঁচাতে হলেও স্বামী ও স্বজনের জোরাজুরিতে সেখানে অস্ত্রোপচার করা হয়। নবজাতকের মাথার কিছু অংশের অস্বাভাবিক আকার ও অচেতন থাকায় তাঁকে নিয়ে স্বজনের ছুটতে হয় ১০০ কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি শিশুটিকে। শুক্রবার রাতে মৃত্যু হয় তার।
এ ঘটনার তিন দিন আগে একই পরিণতির শিকার হন পৌরসভার মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা নুর নাহার (২৬)। তাঁর স্বামী নুর ইসলাম অভিযোগ করেন, নুর নাহারকেও একইভাবে জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে রেফার্ড করে দেয় সরকারি হাসপাতালটি। অনেক চড়াই-উতরাই আর ভাগ্যগুণে তাঁর স্ত্রী ও নবজাতক বেঁচে যায়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের পরও হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন তাদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এবিএম মোজাম্মেল হক বলেন, রোগী বাসায় ডেলিভারির চেষ্টার পর না পেরে আমাদের কাছে আনা হয়েছে।
এ সময় সেখানে ভুক্তভোগী রমজান আলী জানান, রোগী ভর্তি হয় ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টায়। আর ডেলিভারির চেষ্টা হয় পরিদন সকাল সাড়ে ১১টায়। তখন ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এ ঘটনায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- খাগড়াছড়ি
- অস্ত্রোপচার
- প্রসূতির মৃত্যু
