কম্পনের অভিযোগে সোনারগাঁয়ে সিমেন্ট কারখানায় হামলা
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আমান সিমেন্ট কারখানায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয় সমকাল
সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে শব্দদূষণ ও ভূকম্পনের অভিযোগ তুলে মানববন্ধন করে একটি সিমেন্ট কারখানায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা কারখানার প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢুকে কোম্পানির সাইনবোর্ড, চেয়ার ও বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর এবং কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও সিসি ক্যামেরা লুট করে। ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে স্থানীয় বিএনপি নেতার নেতৃত্বে এ হামলা হয় বলে অভিযোগ করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নে হাড়িয়া এলাকায় আমান সিমেন্ট কারখানায় গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এর আগে কারখানাটির বিরুদ্ধে শব্দদূষণ ও ভূকম্পন সৃষ্টির অভিযোগ তুলে এটির প্রধান ফটকের সামনে এলাকার নারী, শিশুসহ কিছু লোক মানববন্ধন করেন। তাতে নেতৃত্ব দেন বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়ন বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য গাজী আওলাদ হোসেন এবং স্থানীয় মজিবুর রহমান ও দিলারা বেগম। পরে তাদের নেতৃত্বে কারখানায় হামলা চালানো হয়।
এ ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যায় কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার নাদিরুজ্জামান বাদী হয়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে সোনারগাঁ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। কোম্পানি কর্তৃপক্ষের দাবি, ঝুট ব্যবসা না দেওয়ায় মানববন্ধনের নামে এ হামলা করা হয়।
সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিববুল্লাহ বলেন, মানববন্ধনের নামে একটি কোম্পানিতে হামলা ও লুটপাট খুবই দুঃখজনক। হামলার ঘটনায় অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (খ-অঞ্চল) মোহাম্মদ ইমরান আহমেদ জানান, পরিবেশ ক্ষতির কারণে মানববন্ধন করার একজন নাগরিকের অধিকার রয়েছে। তবে মানববন্ধনের নামে হামলার খুবই ন্যক্কারজনক ঘটনা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। কম্পনের অভিযোগ তুলে বিষয়টি অন্যদিকে প্রভাবিত করা অন্যায়। অবশ্যই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক এএইচএম রাশেদ জানান, আমান সিমেন্ট কোম্পানি একটি অর্থনৈতিক জোনের ভেতরে। কোম্পানি পরিদর্শন করে প্রতিবেদন ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে এনফোর্সমেন্ট অফিস প্রতিবেদনের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটা আমার জানা নেই।
আমান অর্থনৈতিক অঞ্চলের পাশের সোনামুই গ্রামের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম জানান, আমান সিমেন্ট কোম্পানির শব্দদূষণ হয়। ফলে স্থানীয়রা প্রশাসনে কাছে একাধিকবার অভিযোগ দিয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর পরিদর্শন করে কম্পনের মাত্রা নির্ণয় করে প্রতিবেদন দিয়েছে বলে শুনেছি।
জানা যায়, বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়ন বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য গাজী আওলাদ হোসেন এবং স্থানীয় মজিবুর রহমান ও দিলারা বেগমের নেতৃত্বে নারী-শিশুসহ অর্ধশতাধিক লোকজন বিকেলে আমান সিমেন্ট কোম্পানির প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন করেন। এক পর্যায়ে তারা প্রধান ফটক ভেঙে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে। হামলা থেকে রক্ষা পেতে কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস থেকে বের হয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যান। খবর পেয়ে সোনারগাঁ থানা পুলিশ ও শিল্প পুলিশের একাধিক দল গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে সোনারগাঁয়ের হাড়িয়া এলাকায় ১৫০ একর জমিতে গড়ে ওঠে আমান অর্থনৈতিক অঞ্চল। সেখানে আমান সিমেন্ট মিলস ইউনিট-২ ছাড়াও আমান প্যাকেজিং, আমান শিপইয়ার্ড, আমান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, একিন ফিড, আমান গ্রিন এনার্জিসহ আরও কয়েকটি কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। আমান সিমেন্টের প্রথম ইউনিট সিরাজগঞ্জে।
সূত্র জানায়, হাড়িয়ায় সিমেন্ট কারখানাটি স্থাপনের পর থেকে স্থানীয় এক যুবদল নেতা ঝুট ব্যবসা করে আসছেন। এ ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিতে বিভিন্ন সময়ে চেষ্টা করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা গাজী আওলাদ হোসেন। এর আগেও একই অভিযোগ তুলে একাধিকবার মানববন্ধন করিয়েছেন তিনি। কিন্তু ঝুট ব্যবসা তিনি পাননি।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, আমান সিমেন্ট কোম্পানিতে সিমেন্টের বস্তার মাউথ কার্ড, প্যাকেজিংয়ে ছেঁড়া বস্তা ও লোহার তৈরি যন্ত্রাংশ স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি করা হয়। দু-তিন মাস পরপর এসব ঝুট বিক্রি করা হয়। গড়ে প্রায় ১০-১৫ লাখ টাকার ঝুট বের করা হয় কারখানা থেকে। এ ছাড়া দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে শ্রমিক সরবরাহ করা হয় কোম্পানিতে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ কোম্পানিতে একজন যুবদল নেতা ঝুট ব্যবসা করছেন। এ কোম্পানি গড়ে তোলার সময়ও তিনি নানাভাবে সহযোগিতা করেন।
আমান সিমেন্ট কোম্পানির ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার নাদিরুজ্জমান জানান, সব নিয়মকানুন মেনেই আমান গ্রুপ এখানে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপি নেতা গাজী আওলাদ হোসেনসহ একটি মহল তাদের নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য পরিকল্পিতভাবে নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে এ আন্দোলন করছেন। তারা এলাকাবাসীকে ইন্ধন দিয়ে এ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন। এর আগেও গাজী আওলাদ হোসেন এ কোম্পানিতে এসে তাকে ব্যবসা দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছেন। তাকে তা না দেওয়ার পর থেকে একই ব্যক্তিদের নিয়ে একই অভিযোগ তুলে তিন দফা মানববন্ধন করিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর কয়েক দফা কোম্পানি পরিদর্শন করে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে কম্পনের মাত্রা পরীক্ষা করে উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে।
তিনি আরও জানান, সাজানো মানববন্ধনের নামে কোম্পানির মূল গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে কোম্পানির কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও সিসি ক্যামেরা লুট করা হয়েছে। এ সময় ভয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিরাপদ স্থানে সরে যান। খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
অভিযুক্ত বিএনপি নেতা গাজী আওলাদ হোসেন বলেন, আমান গ্রুপের শব্দদূষণ ও ভূকম্পনের কারণে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। বারবার বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার মেলেনি। রমজান মাসে এ শব্দদূষণ ও ভূকম্পনে এ এলাকার মানুষ অনেক কষ্টের মধ্যে ছিল। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার মানুষ আন্দোলনে নেমেছেন। এ সময় উত্তেজিত লোকজন কারখানায় হামলা করেছেন।
- বিষয় :
- হামলা-ভাঙচুর
