সমিতি করে ঈদের বাড়তি আনন্দে নিম্ন আয়ের মানুষ
মাংস কেটে গোছগাছে ব্যস্ত সমিতির সদস্যরা। গতকাল বুধবার কুমারখালীর জোতমোড়া গ্রামে
কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘আমরা গরিব মানুষ। দিন আনি দিন খাই। বাজারে গোশতের যে দাম। তাতে কিনে খাওয়া যায় না। সমিতিতে প্রতি সপ্তাহে ৫০ টাকা করে জমা দিছিলাম। সারা বছরের জমানো টাকায় প্রায় চার কেজি গোশত পাইছি। ঈদিই বউ ছোয়ালপাল নিয়ে খাব।’ কথা বলতে বলতে হাসি ধরছিল না কুষ্টিয়ার কুমারখালীর দিনমজুর মো. রইচ উদ্দিনের।
উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের এই বাসিন্দা অন্যদের সঙ্গে সমিতি করেছিলেন। এ কারণে গতকাল বুধবার তিনি ওই সমিতি থেকে গরুর মাংস পেয়েছেন। বাজারে যেখানে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৫০-৮০০ টাকা, সেখানে রইচ উদ্দিনের হাতে পাওয়া মাংসের দাম পড়েছে ৬৫০ টাকা।
একই গ্রামের আমিরুল ইসলাম পেশায় ইজিবাইক চালক। তিনি বলেন, বাজারে গরুর মাংসের যে দাম, সংসারের খরচ মিটিয়ে সবাই কিনে খেতে পারে না। তাই ৩০ সদস্যের সমিতির অংশ হয়েছিলেন তিনি। সদস্যদের কেউ প্রতি সপ্তাহে ৫০ টাকা, আবার কেউ ১০০ টাকা করে জমা দেন। কেউ চার কেজি, আবার কেউ আট কেজি করে মাংস পেয়েছেন। এতে সবাই খুশি।
কয়েক বছর ধরে দেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। ফলে বাজার থেকে মাংস কিনে পরিবারের সদস্যদের আমিষের চাহিদা পূরণ করতে পারেন না তারা। আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ঈদে পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে এই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ২০-৩০ জন মিলে গড়ে তোলা হচ্ছে সমিতি, মাংস সমিতি নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
গতকাল সকাল থেকে উপজেলার যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট, চাপড়া, নন্দলালপুর ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সমিতির সদস্যদের কেউ মাংস কাটছেন। কেউ তা সদস্যদের অনুপাতে ভাগ করছেন। কেউ মাংস ওজন করে ব্যাগে ভরছে।
কুমারখালী পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা গফুর শেখ (৪৫) পেশায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। তাঁর দৈনিক আয় ৬০০ টাকা। এ কারণে ৭৫০ টাকা কেজির গরুর মাংস কেনা সম্ভব হয় না। তাই গ্রামের সমিতিতে মাসে ৫০০ টাকা করে জমা দিয়েছিলেন। প্রায় ৯ কেজি মাংস পেয়েছেন গফুর। ফ্রিজে রেখে কয়েক মাস ধরে তাঁর পরিবারের সদস্যরা খেতে পারবেন।
পৌরসভার তেবাড়িয়া গ্রামে অন্তত তিনটি মাংস সমিতি রয়েছে। এর একটির উদ্যোক্তা শহিদুল ইসলাম (৬৮)। তিনি ছয় বছর ধরে মাংস সমিতি পরিচালনা করছেন। এই বছর তাঁর সমিতির সদস্য হয়েছিলেন ১৫০ জন।
সমিতির সদস্য মাসিক ৪০০ টাকা করে জমা দেন জানিয়ে শহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, এবার প্রায় সাত লাখ ২০ হাজার টাকা জমা হয়েছিল। সেই টাকায় ছয়টি ষাঁড় গরু কেনা হয়েছে। তাঁর ধারণা, ছয়টি গরুতে প্রায় ৩০ মণ মাংস হবে। বাজারের চেয়ে
সমিতির মাংসের দাম প্রতি কেজিতে ৭০-১০০ টাকা কম পড়ে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, প্রতিটি গ্রামে প্রায় দুই-তিনটি গরু জবাই করতে দেখেছেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সারাবছর ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে এমন আয়োজন করে। সমিতিতে প্রতি কেজি মাংসের দাম পড়ছে ৬৬৫-৬৭০ টাকা। উপজেলায় ২০০টি গ্রামে অন্তত ৬০০টির বেশি গরু জবাই হয়েছে। এসবের বাজারমূল্য ছয় থেকে সাত কোটি টাকারও বেশি।
গ্রামবাসীর এমন আয়োজনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন কুমারখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, এভাবে সবার মধ্যে মিলেমিশে সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়লে বাজারে চাপ কমবে। পাশাপাশি বাজারে মাংসের দামও কমবে। এ ধরনের সমিতি আরও বেশি বেশি গড়ে তোলা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
- বিষয় :
- মাংস
