আলু চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষি
পটুয়াখালীর গলাচিপায় ক্ষেত থেকে আলু তুলছেন কৃষিশ্রমিকরা। রোববার সদর ইউনিয়নের মুরাদনগর গ্রামের সমকাল
গলাচিপা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
পটুয়াখালীর গলাচিপায় আলু চাষে কৃষকের মধ্যে আগ্রহ কমছে। ন্যায্য দাম না মেলা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় লোকসান গুনতে গুনতে তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এজন্য স্থানীয় উন্নত বাজার ব্যবস্থা না থাকাকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে গলাচিপার চাষিরা প্রায় ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করেন। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬০ হেক্টরে। চলতি ২০২৬ সালে মাত্র ২৬০ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। যদিও এই বছর ৩৬৫ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি বিভাগ।
কৃষকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, গলাচিপা উপজেলার মাটি ও ভৌগোলিক অবস্থান আলু চাষের উপযোগী। ৩৫-৪০ বছর আগে এ উপজেলায় আলুর আবাদ শুরু হয়। ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি বাজারে দাম মিলছিল বলে কৃষকদের মধ্যে আলু চাষে আগ্রহ বাড়তে থাকে।
উপজেলার যেসব এলাকায় আলুর বেশি আবাদ হয়, এর মধ্যে রয়েছে– সদর ইউনিয়নের মুরাদনগর, চরখালী, বোয়ালিয়া, পানপট্টি ইউনিয়নের উত্তর পানপট্টি, সতিরাম, দক্ষিণ পানপট্টি। কৃষকরা জানিয়েছেন, প্রতি হেক্টরে তারা গড়ে প্রায় ২৫ টন আলু উৎপাদন করেন। তবে উন্নত বাজার ব্যবস্থা ও সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় উৎপাদিত আলু ধরে রাখতে পারছেন না। বাজারেও দাম মিলছে কম। ফলে বছরের পর বছর ধরে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে আলু চাষ করেন সদর ইউনিয়নের মুরাদনগরের কৃষক মো. হাফিজুর রহমান হাওলাদার। তাঁর ভাষ্য, চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে সার, সেচ, বীজ ও শ্রমিক বাবদ খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অথচ বাজারে প্রতি বিঘায় উৎপাদিত আলু বিক্রি করে দাম পাচ্ছেন ১৫-২০ হাজার টাকা। এতে লোকসান হচ্ছে ১০-১৫ হাজার টাকা।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বড় ভাই আজিজ হাওলাদার, আমি ও পরিবারের অন্যরা বহু বছর ধরে আলু চাষ করছি। পরপর কয়েক বছর লোকসান হওয়ায় অন্যরা চাষ বন্ধ করে দিয়েছেন।’ তিনিও আগামী মৌসুমে আলু চাষ করার আগে দুইবার ভাববেন।
বোয়ালিয়া গ্রামের চাষি মো. মিলন হাওলাদারের ভাষ্য, এইভাবে লোকসান হলে ভবিষ্যতে আর আলু চাষ সম্ভব হবে না। তারা ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও আলু সংরক্ষণে হিমাগার স্থাপনের দাবি জানান।
গলাচিপা বন্দর বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক তাপস দত্ত বলেন, উপজেলায় হিমাগার বা আলু সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা নেই। তাই আলু সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কৃষকদের কম দামে আলু বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে পাইকারি ক্রেতারাও তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজু আক্তার জানান, দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে এই এলাকায় আলুর ফলন দেরিতে হয়। ফলে চাষিরা তুলনামূলক কম দাম পান। দ্রুত সংরক্ষণ ব্যবস্থা বা হিমাগার গড়ে তোলা না গেলে এ অঞ্চলে আলু চাষে আগ্রহ আরও কমে যেতে পারে। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আলুর ন্যায্যমূল্য দাবিতে মিছিল
জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বাজারের অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত আলুচাষিদের দ্রুত ক্ষতিপূরণের দাবিতে জেলায় লাল পতাকা নিয়ে মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুরে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা কমিটির আয়োজনে শহরের চিনিকল সড়কে দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিলটি বের করা হয়। প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে তারা পাঁচুর মোড়ে সমাবেশে মিলিত হন।
সেখানে বক্তারা আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত ও সরকারি খরচে কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছানোর দাবি তোলেন। তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আলুর বাজারের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি হিমাগার কম থাকায় সংরক্ষণের অভাবে আলুচাষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকের এই ক্ষতি শুধু তাদের ব্যক্তিগত নয়, এটি সমগ্র দেশের কৃষি অর্থনীতির ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের বাঁচাতে দ্রুত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।
জেলা বাসদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ ওয়াজেদ পারভেজের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন সিপিবি জেলা কমিটির আহ্বায়ক বদিউজ্জামান বদি, সাধারণ সম্পাদক রমজানুজ্জামান প্রমুখ।
- বিষয় :
- আলু
