সাড়ে ৭ কোটি টাকার বালুমহাল দর উঠছে তিন কোটির কম
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের দরপত্রে সরকারি ইজারা মূল্য ধরা হয়েছে সাত কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। প্রথমবার ১৪টি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা
পড়ে ৩টি। দ্বিতীয়বার মাত্র ৩টি শিডিউল বিক্রি হয়। জমা পড়ে ওই তিনটিই। গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় দরপত্র খোলা হলে দেখা যায় সর্বোচ্চ দর উঠেছে মাত্র দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, ইজারা নিতে আগ্রহী প্রভাবশালীরা সমঝোতার মাধ্যমে অস্বাভাবিক কম দর হাঁকিয়েছেন। দুই বছর আগে এই বালুমহালের মূল্য উঠেছিল ১১ কোটি ১১ লাখ টাকা।
১৪৩৩ বঙ্গাব্দের জন্য এই বালুমহাল ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে এমন অস্বাভাবিক কম দর দিচ্ছেন আগ্রহী ব্যক্তিরা। গত ২৯ মার্চ প্রথমবার দরপত্র উন্মুক্তের দিন জেলা প্রশাসক ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা স্পষ্ট ভাষায় জানান, সরকারি মূল্যের তুলনায় এত কম দর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দর খোলার সময় তার অসন্তোষও ছিল প্রকাশ্য; যা পুরো প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দরপত্র স্থগিত করেন এবং পুনরায় আহ্বানের ঘোষণা দেন। দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।
জেলা রাজস্ব বিভাগের সূত্রমতে, লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের জন্য প্রথম দফায় ১৪টি শিডিউল বিক্রি হলেও জমা পড়ে মাত্র ৩টি। অংশ নেয় খান এন্টারপ্রাইজ, সজীব করপোরেশন ও জমিদার এন্টারপ্রাইজ। অভিযোগ উঠে প্রভাবশালীরা সমঝোতার মাধ্যমে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে নামমাত্র মূল্য দিয়ে বালুমহালটি ইজারা নিতে চাইছেন।
জানা যায়, ১৪৩০ বঙ্গাব্দে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা নদীতে লেছড়াগঞ্জ বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। যার সরকারি মূল্য ধরা হয় দুই কোটি টাকার কিছু বেশি। ওই সময় প্রতিযোগিতা করেন সাবেক এমপি সংগীতশিল্পী মমতাজ বেগমের লোকজন এবং দেওয়ান সাইদুর রহমান। সেবার হরিরামপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান সাঈদুর রহমান চার কোটি ৩ লাখ টাকা দিয়ে বালুমহালের ইজারা নেন। পরের বছর ১৪৩১ বঙ্গাব্দে ইজারা মূল্য লাফিয়ে ওঠে ১১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ১১১ টাকায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২.৭৬ গুণ বেশি। সে সময় ইজারা পায় সাবেক এমপি মমতাজের ঘনিষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা আবিদ হাসান বিপ্লবের প্রতিষ্ঠান এশিয়ান বিল্ডার্স। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ১৪৩২ বঙ্গাব্দে হঠাৎ উল্টো স্রোতে রাজস্ব নেমে আসে পাঁচ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার ৭৯ টাকায় অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫২.০৯ শতাংশ কম। ইজারা পায় মিথিলা এন্টারপ্রাইজ, তাদের প্রস্তাব ছিল ৫ কোটি ৩২ লাখ ৩২ হাজার ৩২ টাকা। আর এবার ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে দর নেমে আসে তিন কোটি টাকার নিচে; যা সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৬৪.৬ ভাগ কম মূল্য।
অভিযোগের তীর এবার প্রশাসনের দিকেও। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঠিকাদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সখ্যতার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা ছাড়িয়ে কয়েক কিলোমিটার বাইরে বালু উত্তোলনের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কার্যত কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় ইজারাদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চৌহদ্দি উপেক্ষা করে পছন্দের স্থানে বালু উত্তোলন চলে প্রকাশ্যেই। সচেতন মহলের মতে, সরকারের রাজস্ব হ্রাসের এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রশাসনিক ছত্রছায়া ও ক্ষমতাসীন দলের মদদ।
প্রথমবার ২৯ মার্চ দরপত্র উন্মুক্তের সময় জেলা প্রশাসক ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানা জানান, লেছড়াগঞ্জ বালুমহালে সরকারি মূল্য ছিল ৭ কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা। শিডিউল জমা পড়ে তিনটি। এর মধ্যে খান এন্টারপ্রাইজ দর দিয়েছে দুই কোটি ২০ লাখ টাকা, জমিদার এন্টারপ্রাইজ দর দিয়েছে এক কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সজীব করপোরেশন সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য থাকায় দরগুলো গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দ্বিতীয়বার দরপত্র খোলার সময় দেখা যায় আগের তিন প্রতিষ্ঠানই ফের দরপত্র জমা দিয়েছে। এবার খান এন্টারপ্রাইজ ৫০ লাখ টাকা বাড়িয়ে দর দিয়েছে দুই কোটি ৭০ লাখ টাকা, জমিদার এন্টারপ্রাইজ এক কোটি টাকা বাড়িয়ে দর দিয়েছে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং সজীব করপোরেশন দিয়েছে দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা। বিধি অনুযায়ী সরকারি নির্ধারিত মূল্যে (৭ কোটি ৪২ লাখ ৪৮ হাজার ৮০ টাকা) কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল না করায় জেলা প্রশাসক দ্বিতীয়বারের দরপত্র বাতিল করে তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বান করেন। এতে ইজারা নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা ৫ ও ৬ এপ্রিল লেছড়াগঞ্জ বালুমহালের দরপত্রের শিডিউল সংগ্রহে এবং ৭ এপ্রিল জমা দিতে পারবেন। পরদিন জমাকৃত দরপত্র খোলা হবে।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা সমকালকে বলেন, বালুমহাল ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী সরকারের নির্ধারিত মূল্য থেকে যদি কম মূল্য দিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়, সে ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার দরপত্র আহ্বান করা হয়। দ্বিতীয়বারও যদি কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়া যায় তবে তৃতীয়বার আহ্বান করা হয়। তৃতীয়বারেও একই ঘটনা ঘটলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বিধি অনুযায়ী আমরা বালুমহাল ইজারা দিয়েছি। ইজারা দেওয়ার পর যদি কোনো ঠিকাদার নির্দিষ্ট সীমারেখার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন করেন, তাহলে সরকারি বিধি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
- বিষয় :
- বালুমহাল
