ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বাবা কবে ফিরবে, জানতে চায় নিশান-সৃজন

মায়ের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, মামলায় কারাগারে বাবা

বাবা কবে ফিরবে, জানতে চায় নিশান-সৃজন
×

সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলছে ৭ বছরের নিশান মণ্ডল। পাশে ছোট ভাই সৃজন। সোমবার কাশিয়ানীর সিঙ্গা গ্রামে। ছবি: সমকাল

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:০৪

মায়ের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়েছে দুদিন আগে। আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগে হওয়া মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গেছেন বাবা। গ্রেপ্তারের ভয়ে দাদা ও দুই চাচা দিয়েছেন গা-ঢাকা। এই অবস্থায় অসহায় জীবনের মুখোমুখি হয়েছে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর দুই শিশু। প্রতিবেশীর বাড়িতে সাময়িক আশ্রয় জুটলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থেমে থেমে কাঁদছে নিশান মণ্ডল (৭) ও তার ছোট ভাই সৃজন মণ্ডল (৫)।

সোমবার সকালে শিশু দুটিকে পাওয়া যায় উপজেলার সিঙ্গা পশ্চিমপাড়া গ্রামে। সড়কের পাশে নিরবে দাঁড়িয়ে বাবা মিলন মণ্ডলের (৩৭) ফেরার অপেক্ষায় ছিলো তারা। অবুঝ শিশু দুটির ধারণাই নেই, তাদের বাবার কারাবাস শেষ হবে কবে। আশপাশের মানুষের শান্ত্বনায় কোনোভাবেই তাদের কষ্ট কমাতে পারছে না। অসহায় শিশু দুটি শুধু জানতে চায়, তাদের বাবা কবে ফিরবে?

শনিবার সিঙ্গা গ্রাম থেকেই নিশান-সৃজনের মা স্বপ্না বাড়ৈয়ের (২৬) ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। স্বপ্নার বাবা জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার কলাবাড়ি ইউনিয়নের কুমুরিয়া গ্রামের পরেশ বাড়ৈ এ ঘটনায় মামলা করেন। পুলিশ সেদিনই স্বপ্নার স্বামী মিলনকে গ্রেপ্তার করে। রোববার আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। 

প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, পেশায় দিনমজুর মিলনের সঙ্গে স্বপ্নার বিয়ে হয় ৯ বছর আগে। বিয়ের কয়েক বছর সংসারে ঝামেলা ছিলো না। কিন্তু একপর্যায়ে স্বপ্নার মানসিক ভারসাম্যহীনতা ধরা পড়ে। শুরুতে খুলনায় চিকিৎসা নিতে হয়। পরবর্তীতে এলাকাবাসীর আর্থিক সহযোগিতায় পাবনা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। এরই মধ্যে দুই সন্তানের জন্ম হয়। অর্থাভাবে স্ত্রীর চিকিৎসা ও নিয়মিত ওষুধ আনতে পারেননি মিলন। যে কারণে স্বপ্না আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুক্রবার রাতে দুই ছেলেকে ঘরে রেখেই আড়ার সঙ্গে কাপড় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। 

স্বপ্নার বাবা পরেশ বাড়ৈয়ের অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে মানসিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে করে আসছিলো শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এ কারণে সে আত্মহত্যা করেছে। তিনি বলেন, ‘মেয়ের কাছে জানতে পেরেছি, জামাই মিলনের সঙ্গে এক নারীর সম্পর্ক রয়েছে। মেয়ে এটি সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে।’

যদিও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যের সত্যতা যাচাই করা যায়নি। জানকী মণ্ডল ও উৎসব মন্ডল নামের দুই প্রতিবেশীর ভাষ্য, স্বপ্নার মানসিক সমস্যা তাদের নজরে আসে বিয়ের দুই বছর পর। আচার-আচরণ ও চলাফেরায় অস্বাভাবিকতা দেখে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে টাকা তুলে পাবনায় চিকিৎসা করানো হয়েছে।

তারা বলেন, পাবনা থেকে আসার পর কিছুদিন ভালো ছিল। এরপর আবারও একই আচরণ শুরু করেন স্বপ্না। তাঁর আত্মহত্যার পর স্বামী জেলে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে মিলনের বাবা নিরোধ মন্ডল ও তাঁর দুই ভাই পলাতক। 

বাড়িতে কেউ না থাকায় মিলন-স্বপ্নার দুই ছেলে অসহায় হয়ে পড়েছে। এক প্রতিবেশীর বাড়িতে তাদের সাময়িক আশ্রয় মিলেছে। শিশু দুটির কথা বিবেচনা করে মিলনের মুক্তির দাবি জানান এলাকাবাসী।

এ বিষয়ে কাশিয়ানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের ভাষ্য, স্বপ্নার বাবা আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ এনে মামলা করেছেন। এ মামলায় মিলন মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, স্বপ্নার মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে। লাশও স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করছেন। তদন্তে মিলনের দায় পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

আরও পড়ুন

×