এক ছাগলে বদলে যাওয়া জীবন
পটুয়াখালীতে ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগলের খামার করে নজর কেড়েছেন নারী উদ্যোক্তা মমতাজ বেগম। সম্প্রতি তোলা -সমকাল
মুফতী সালাহউদ্দিন, পটুয়াখালী
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৪১ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
সংসারে অভাব ঘোচাতে বছর চারেক আগে একটি ছাগল কেনেন গৃহবধূ মমতাজ বেগম। তখন ছাগলটির পেটে বাচ্চা ছিল। কেনার এক মাস পর তিনটি বাচ্চা দেয়। পাঁচ মাস পর বাচ্চা দেয় আরও দুটি। এর পর ধীরে ধীরে চার বছরে একটি ছাগল থেকে ৬৭টি ছাগল হয়েছে। এতে স্বাবলম্বী হয়েছেন মমতাজ, ঘুচিয়েছেন সংসারের অভাব। তাছাড়া তাঁর এই সাফল্য অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে গ্রামের অন্য নারীরাও ছাগল পালনে ঝুঁকছেন।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের হাজিপুর গ্রামের খোরশেদ আলমের স্ত্রী মমতাজ বেগম। ছাগল পালনের আয়ে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন এই দম্পতি। ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ছাগল পালনের টাকা দিয়ে এখন পাকা বাড়ি করার স্বপ্ন মমতাজের।
সম্প্রতি তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানের এক কোণে এক পাল ছাগলকে খাবার দিচ্ছেন এই নারী। সারাদিন ঘরের অন্যান্য কাজের ফাঁকে তিনি ছাগলগুলোর পরিচর্যা করেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করেন স্বামী ও মেয়ে। সাফল্যের গল্প জানতে চাইলে পুরোনো দিনের কথা ভেবে মমতাজের চোখে পানি চলে আসে।
তিনি জানান, ৩৫ বছর আগে খোরশেদ আলমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বসতবাড়ি ছাড়া স্বামীর জায়গা-জমি তেমন ছিল না। অভাবে দিন কাটত। বাড়ির পাশে ছোট্ট দুটি ডোবায় পোনা মাছের চাষ করেন খোরশেদ। কিন্তু এতে সংসার চলত না। তা ছাড়া শারীরিক অসুস্থতার কারণে তেমন পরিশ্রমও করতে পারতেন না তিনি। এরপর সংসারের জন্য কিছু একটা করার চিন্তা করেন মমতাজ। সেই ভাবনা থেকে ২০২২ সালে ৯ হাজার টাকা ধার করে একটি ছাগি কেনেন। সেই একটি ছাগি থেকে তাঁর বাড়িতে এখন একপাল ছাগল। বসতঘরের পাশেই করেছে ছোট্ট একটি খামার। দিনভর বাড়ির উঠানজুড়ে ঘুরে বেড়ায় ছাগলগুলো। তাদের যত্নে ব্যস্ত থাকেন মমতাজ বেগম ও স্বামী-সন্তান।
মমতাজ এখন অনুপ্রেরণা
তিন বছরের ব্যবধানে গ্রামের নারীদের কাছে মমতাজ এখন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। তাঁর দেখাদেখি গ্রামের অনেকেই শুরু করেছেন ছাগল পালন। আগ্রহী অনেককে তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রতিবেশী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘মমতাজ আপার ছাগল পালন দেইখ্যা আমাগো ভালো লাগতাছে। আমাগোও মন চায় মমতাজ আপার মতো এমন উদ্যোক্তা হই এবং ছাগল পাইল্লা স্বাবলম্বী হই।’
আরেক প্রতিবেশী মাহিনুর বেগম জানান, মমতাজ ৯ হাজার টাকা ধার করে ছাগল পালন করে এখন কয়েক লাখ টাকা আয় করছেন। তাঁর ভাগ্য বদলে গেছে। সংসারের অভাব ঘুচেছে। ছাগল বিক্রির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ জোগান দিচ্ছেন। মমতাজের সফলতা দেখে মাহিনুরও ছাগল পালন করার পরিকল্পনা করছেন।
মমতাজ বেগম বলেন, ‘তিন বছরে ৬৭টি ছাগলের মধ্যে ৪৫টি ছানা বিক্রি করেছি আড়াই লাখ টাকায়। একটি ছাগল ছানা বয়স অনুযায়ী দুই থেকে আট হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হয়। এখনও ছোট-বড় মিলে ২২টি ছাগল রয়েছে। এগুলো অনেক বড় হইয়্যা গ্যাছে। দুইডা ছাগল এক লাখ টাকা কইছিল, কিন্তু দিই নাই। এই ছাগল পালন কইরা মুই স্বামী-সন্তান লইয়্যা এহোন সুখেই আছি। ভালোভাবে দিন কাটাইতে পারছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘মোর দেহাদেহি এই এলাকায় অনেক মহিলা এহোন ছাগল লালন-পালন শুরু কইরা দিছে। তারাও অনেক ভালো করতাছে। মোরা মহিলারা সবাই যদি উদ্যোগী হয়ে স্বামীর পাশাপাশি উদ্যোক্তা হই, তাইলে কারোইর সংসারে অভাব-অনটন থাকব না।’
মমতাজ বেগমের স্বামী খোরশেদ আলম বলেন, ‘মমতাজের ছাগল পালনের উদ্যোগ দেখে আমিও তাকে উৎসাহী দিই। ১০ থেকে ১১ মাস বয়স হলেই ছাগলের বাচ্চা বিক্রি করি আমরা। তবে খাসি বিক্রি করি। ছাগি বিক্রি করি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মূলত পাঁঠার কারণে বাচ্চা ভালো হয়। তাই ভালো জাতের একটি পাঁঠা কিনি। আরও পাঁচটি ছাগল বাচ্চা দেবে শিগগিরই। মমতাজের খামার বড় করে দেওয়ার ইচ্ছা আছে। কিন্তু জায়গার খুব সংকট। খামারের বেশির ভাগ ছাগলই পাঁচ-ছয় মাস পর আবার বাচ্চা দেবে। তখনই জায়গা সংকট দেখা দেবে।’
বাড়ছে ছাগলের খামার
পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জানান, জেলায় দিন দিন নারী উদ্যোক্তা বাড়ছে। তাদের অনেকে ছাগল পালনে এগিয়ে আসছেন। এখানে ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল পালন বেশি হচ্ছে। এতে একদিকে বেকার নারীদের সমস্যা দূর হচ্ছে এবং দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পটুয়াখালী জেলা ছাগল পালনের জন্য উপযুক্ত। এখানে ছোট-বড় এক হাজার ১৩৭টি ছাগলের খামার রয়েছে। এসব খামারে ছাগলের রয়েছে ছয় লাখ ৮০ হাজার ১০টি। খামারিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ভ্যাকসিনসহ ছাগল পালনে প্রয়োজনীয় যা কিছু দরকার হয়, তা সরবরাহ করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- ছাগল
