ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বৈশাখের প্রথম দিনটিই যেন বেছে নিল হাবিবার ছেলে

বৈশাখের প্রথম দিনটিই যেন বেছে নিল হাবিবার ছেলে
×

শরীয়তপুর সদরের রূপসী বাংলা হাসপাতালে ছেলে কোলে হাবিবা। ছবি : সমকাল

বিপ্লব হাসান হৃদয়, শরীয়তপুর

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৫:৩৮

নববর্ষ মানেই নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন আর নতুন শুরুর গল্প। সেই নতুন শুরুর দিনেই শরীয়তপুরের একটি পরিবারে যোগ হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। নবজাতকের আগমনে পূর্ণতা পেয়েছে সেই অধ্যায়। 

শরীয়তপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া গ্রামের মেহেদী হাসান ও হাবিবা আক্তার দম্পতির ঘরে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে জন্ম নিয়েছে একটি পুত্রসন্তান। বাংলা নববর্ষের এই আনন্দঘন দিনে নতুন প্রাণের আগমন এ দম্পতির জীবনে নিয়ে এসেছে অন্যরকম এক আলো।

হাবিবার সন্তান জন্মদানের সম্ভাব্য তারিখ ছিল ৫ মে। কিন্তু সময়ের আগেই সোমবার (১৩ এপ্রিল) সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় তাঁর প্রসব বেদনা। সেই ব্যথা তীব্র হয়ে উঠলে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে একটি ভ্যানে করে প্রায় ৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাঁকে নেওয়া হয় শরীয়তপুর সদরের বেসরকারি রূপসী বাংলা হাসপাতালে। কাঁচা পাকা পথ পেরিয়ে ব্যথায় কাতর হাবিবার সেই যাত্রা যেন গ্রামীণ জীবনের এক সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা জানান, পরিস্থিতি জটিল। পানি নেমে গেছে, শিশুর অবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ। স্বাভাবিক প্রসব সম্ভব নয়, জরুরি সিজারিয়ান অপারেশনই একমাত্র উপায়। অবশেষে, সব উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কা ফেলে মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে পৃথিবীর আলো দেখে একটি ফুটফুটে ছেলে শিশু। পহেলা বৈশাখের সকালটি হাবিবার পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে দ্বিগুণ আনন্দের। বাইরে যখন নববর্ষের উৎসব, হাসপাতালের ভেতরে তখন নতুন জীবনের আগমনে আনন্দের ফল্গুধারা।

শরীয়তপুর শহরের শহীদ মিনার এলাকায় যখন পহেলা বৈশাখের আয়োজন চলছিল, তখন হাসপাতালের একটি কক্ষেই বিরাজ করছিল অন্যরকম এক বৈশাখী আবহ। বাইরের উৎসবের ঢাকের শব্দ না পৌঁছালেও, ভেতরে নতুন জীবনের কান্নাই যেন হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বড় আনন্দের সুর।

নবজাতকের নানা আলমগীর সরদার নাতির খবর শুনেই ছুটে আসেন। হাতে করে নিয়ে আসেন একটি ছোট্ট গোলাপি জামা। চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক নিয়ে তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। পহেলা বৈশাখের দিনে নাতির জন্ম আমাদের জন্য বিশেষ এক আশীর্বাদ। মনে হচ্ছে, আমাদের ঘরজুড়ে সুখ নেমে এসেছে।

শিশুটির দাদি নুরজাহান বেগমও আবেগাপ্লুত। নাতিকে কোলে নিয়ে তিনি বলেন, আমার ছয় সন্তানের মধ্যে মেহেদি পঞ্চম। আজ তাঁর ঘর আলো করে নাতির আগমন আমাদের জন্য অনেক বড় সুখের খবর। পহেলা বৈশাখের মতো দিনে আরও বেশি আনন্দ লাগছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসক ও নার্সরাও এই আনন্দে শামিল হন। তারা নবজাতক ও তার পরিবারকে শুভেচ্ছা জানান এবং আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা প্রদান করেন বলেন জানান হাবিবার পরিবার।  

প্রসবের কঠিন সময়টিতে হাবিবার পাশে ছিলেন তার স্বামী মেহেদী হাসান, শাশুড়ি নুরজাহান বেগম ও মা লাকী আক্তার। পরিবারের এই উপস্থিতি আর ভালোবাসাই তাকে সাহস জুগিয়েছে।

রুপসী বাংলা হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, প্রসব বেদনা নিয়ে গতকাল হাসপাতালে আসার পর রোগীকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় এবং সিজারিয়ান অপারেশনের পরামর্শ দেওয়া হয়। আজ সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি সুস্থ ছেলে সন্তানের জন্ম হয়।
তিনি আরও জানান, অপারেশনের পর মা ও নবজাতক দুজনেই ভালো আছেন। পহেলা বৈশাখের মতো বিশেষ দিনে শিশুটির জন্ম হওয়ায় হাসপাতালের পক্ষ থেকে পরিবারটিকে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে।

একাদশ শ্রেণিতে পড়াকালীন পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় হাবিবার। অল্প বয়সেই সংসার জীবনে পা রাখা এই তরুণী এখন মা। তার কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসার ছাপ স্পষ্ট। হাবিবা বলেন, বিয়ের পর থেকেই আমার স্বামী সবসময় আমার পাশে থেকেছে। তার সমর্থনটাই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি। পহেলা বৈশাখের দিনে আমার সন্তানের জন্ম এটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত।

তিনি আরও বলেন, ছেলের নাম এখনও ভাবিনি। তবে ছেলের বাবা, দাদা দাদি যা রাখেন তা-ই হবে। আমার প্রথম সন্তান, আমার স্বপ্ন ওকে মানুষ করা। ও অনেক বড় কিছু হবে। তাকে ঠিকভাবে লালন পালন করাই এখন আমার বড় কাজ। 

আরও পড়ুন

×