মাদ্রাসায় বেতন নেই, তাই সবজি বিক্রি
সড়কের পাশে পাটি বিছিয়ে সবজি বিক্রি করছেন শিক্ষক আব্দুল কাইউম। সম্প্রতি কালীগঞ্জ সদরের থানা রোডে সমকাল
জামির হোসেন, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ)
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৯:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিনা বেতনে ২৬ বছর ধরে মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন আব্দুল কাইউম। তাঁর প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত নয়। ফলে সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে সড়কের পাশে বছরখানেক আগে শুরু করেছেন সবজি বিক্রি। প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগলেও তা ভাঙতে দেরি লাগেনি। প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে তাঁকে দেখা যায় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা সদরের থানা রোডে।
সম্প্রতি এক বিকেলে তাঁকে সবজি বিক্রি করতে দেখা যায়। পাটি পেতে গুছিয়ে রেখেছেন বেগুন, কলা, ঢ্যাঁড়শ, উচ্ছে, পটোল, মরিচসহ মৌসুমি সবজি। মাঝেমধ্যে দু’একজন ক্রেতা আসছেন, চাহিদামতো সবজি মেপে তুলে দিচ্ছেন তাদের ব্যাগে।
উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে আব্দুল কাইউম। তিনি উপজেলার মহিষাডেরা নিয়ামতপুর দাখিল মাদ্রাসায় ইবতেদায়ি জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ২০০০ সালে। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় কোনো বেতন-ভাতা পান না। অন্যদিকে ছেলেমেয়ের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ বাড়ছে। বাধ্য হয়ে বছরখানেক আগে সবজি বিক্রি শুরু করেন।
আব্দুল কাইউম বলেন, পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া এক বিঘা জমির ধানে কোনোমতে বছরের খোরাকি হয়। এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি মক্তবে মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতনে শিশুদের পাঠ দেন। সেখানেও বেতন অনিয়মিত। তাই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। শেষে লোকলজ্জা ভুলে পথের ধারে সবজি বিক্রি শুরু করেন। প্রথম প্রথম নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক- শিক্ষার্থীর সঙ্গে দেখা হলে অস্বস্তি বোধ করতেন। এখন তা সয়ে গেছে।
পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম। স্ত্রী গৃহিণী। বড় মেয়ে সানজিদা খাতুন আলিম পরীক্ষার্থী। ছেলে মাশরাফি আহমেদ মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। ছোট মেয়ে সাদিয়া খাতুন (৫) এখনও ভর্তি হয়নি। তিনি বলেন, দিন যত যাচ্ছে, সংসারের খরচ ততো বাড়ছে।
আব্দুল কাইউম জানান, প্রতি ভোরে কালীগঞ্জ সবজির আড়ত থেকে সবজি কেনেন। প্রথম দফায় সকাল ৮টা-৯টা পর্যন্ত বিক্রি করেন। পরে সেখান থেকে যান মাদ্রাসায়। মাদ্রাসা থেকে ফিরে বেলা ৩টার পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি করেন। এতে গড়ে তাঁর আয় হয় ৪০০-৫০০ টাকা।
তিনি যেখানে কর্মরত, সেই মহিষাডেরা নিয়ামতপুর দাখিল মাদ্রাসাটি ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত। কয়েক বছর পরই একাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করে এটি। কিন্তু শিক্ষকদের
নিবন্ধন জটিলতায় একাডেমিক স্বীকৃতি নবায়ন করা হয়নি। ২০২৫ সালে আবার একাডেমিক স্বীকৃতি পুরোনো কাগজপত্রেই নবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে এখানে পড়ছে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী।
প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ হিসেবে ২০১৪ সালে যোগ দেন জুলফিক্কার আলম। তিনি বলেন, বর্তমানে এখানে তিন নারীসহ ১৫ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। কেউই বেতন পান না। তাই কিছুদিন আগে দুজন চলেও গেছেন। তিনি বলেন, ‘বেতন না পেলে শিক্ষকতা করা অসম্ভব। তাই কেউ কেউ জীবিকার প্রয়োজনে বিকল্প যে কোনো পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।’
কালীগঞ্জের ইউএনও রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘মাদ্রাসাটিতে কেউই বেতন-ভাতা পান না, বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানলাম। বিষয়টি নিয়ে আমার কাছে এলে বিস্তারিত জেনে ব্যবস্থা নেব।’
ঝিনাইদহ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফর রহমানের ভাষ্য, এমপিওভুক্তির আবেদন করতে অনেক নিয়ম মানতে হয়। এই প্রতিষ্ঠান একাডেমিক স্বীকৃতির নবায়ন না করায় এমপিও পায়নি। এখন যেহেতু একাডেমিক স্বীকৃতির নবায়ন করেছে নিয়মতান্ত্রিকভাবে এমপিওভুক্ত হতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কর্তৃপক্ষ আবেদন করতে পারবে।
- বিষয় :
- সবজি
