ধানের দাম নিয়ে হাওরজুড়ে হতাশা
জলাবদ্ধতায় ধান পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। সেই ধান কাটার পর শুকিয়ে মাড়াইয়ের জন্য স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। মধ্যনগরের পিঁপড়াকান্দা সমকাল
ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রায় এক দশক আগে অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ জেলার সবক’টি হাওরের শতভাগ ফসল পানিতে তলিয়ে ভেঙে গিয়েছিল বোরো চাষিদের স্বপ্ন। চলতি মৌসুমে আরও একবার চৈত্রের ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতায় তলিয়েছে হাওরের বোরো চাষির আবাদকৃত সহস্রাধিক হেক্টর জমির ফসল। যেটুকু ফসল টিকেছে বাজারে তারও ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। বর্তমান পরিস্থিতিতে লাভ-লোকসানের হিসাবে কোথায় দাঁড়ায়, তা বুঝতে সবশেষ ধান ও চালের সরকারি দাম নির্ধারণের প্রতীক্ষায় ছিলেন বোরো চাষিরা। গত বুধবার সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকের ধান ও চাল ক্রয়ের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। যা রীতিমতো হতাশ করেছে বোরো চাষিদের।
জেলার ধর্মপাশা উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক শফিকুল ইসলাম জানান, এ বছর ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান, ৪৯ টাকা কেজি দরে সেদ্ধ চাল কিনবে সরকার। এ ছাড়া আতপ চাল কেনা হবে ৪৮ টাকা কেজি দরে। গত বছরও কৃষকের ধান ও চাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে এই একই দর নির্ধারণ করা হয়েছিল। এমন অবস্থায় কৃষকরা বলছেন, জলাবদ্ধতায় ফসলহানি আর ধান সংগ্রহে প্রতিবন্ধকতা সরকারের পূর্বের বাজার দরে ধান ও চাল ক্রয়ের সিদ্ধান্তে বেকায়দায় পড়বেন তারা। এর মাঝে ফড়িয়া আর চাতাল মালিকদের কারসাজিতে এবার নিঃস্ব হতে হবে তাদের।
চলতি মৌসুমে ধর্মপাশা উপজেলার ১৮ হাজার ২৯০ হেক্টর এবং মধ্যনগর উপজেলার ১৩ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ করেছেন এখানকার চাষিরা। কৃষি দপ্তরের সূত্র বলছে, এরই মধ্যে এই দুই উপজেলার অন্তত ৬৫৫ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে চৈত্রের বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে টগার হাওরে। এ হাওরে দুই হাজার ৩৪০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১৮০ হেক্টরেরও বেশি জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত দুই উপজেলায় ৯ হাজার ১৯১ হেক্টর অর্থাৎ ৩৬.৫% জমির ধান কর্তন করা হয়েছে। যা গত মৌসুম থেকে ২০ শতাংশ কম। জলাবদ্ধতায় ধান তলিয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া কৃষি শ্রমিকের সংকট রয়েছে। এ কারণে ধান কাটায় গতি আসছে না।
হাওরের অর্থনীতি মূলত দাঁড়িয়ে আছে কৃষির ওপর। যার বড় একটি অংশ বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল। অথচ প্রতি বছরই অনিয়মের ফসল রক্ষা বাঁধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শ্রমিক সংকট, অস্থিতিশীল বাজার আর মধ্যস্বত্বভোগীদের চালবাজিতে বিপর্যস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে প্রান্তিক চাষিদের। আর যদি ফসলহানির ঘটনা ঘটে, সেই মৌসুমে অনেকের পরিবারের জন্যও বছর পার করার মতো চালের জোগান হয় না।
এদিকে ভেজা ধান সংগ্রহে না রেখে শ্রমিকের মজুরি ও ঋণ পরিশোধের তাগিদে কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। অন্যদিকে হাওর থেকে উপজেলা সদর পর্যন্ত ধান পরিবহনের উপযুক্ত সড়ক এবং নৌপথে ধান-চাল পরিবহনের আদর্শ ব্যবস্থা না থাকায় হাওরে রেখেই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন অনেক কৃষক। যেখানে সরকারি দামে মণপ্রতি তাদের এক হাজার ৪০০ টাকার বেশি পাওয়ার কথা।
প্রতিবারের মতো এবারও বৈশাখের শুরু থেকেই ফড়িয়ারা হাওরাঞ্চলে তৎপর। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন চাতাল মালিক ও ধান ব্যবসায়ীরা ধান সংগ্রহ করছেন। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, চাতাল মালিক ও স্থানীয় ধান ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে ধানের দামে আরও ভাটা পড়েছে।
ধর্মপাশার শালকুমড়া হাওরের কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, ‘কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। সেই সঙ্গে পানিতে ভেসে গেছে কষ্টের ফসল। বাজারে দর বাড়েনি। যে দর তাতেও বিক্রির নিশ্চয়তা নেই। সব মিলিয়ে কৃষক ও তার ফসলের নিরাপত্তাহীনতা প্রকট হয়ে উঠেছে। উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে ধানের ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করা জরুরি। সরকারের ঘোষিত দরে কৃষকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।’
ধর্মপাশার পাইকুরাটি ইউনিয়নের সুনই গ্রামের কৃষক গোলাম হুসাইন বলেন, এক বিঘা (৩২ শতক) বোরো ধান উৎপাদনে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে খরচ পড়ে প্রায় ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। প্রতি বিঘা জমিতে ধান পাওয়া যায় ২০ থেকে ২২ মণ। যা বিক্রি করা যায় ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকায়।
ধর্মপাশার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের কৃষক সারোয়ার হোসেন বলেন, যারা বর্গা নিয়ে চাষ করেছেন, তাদের প্রতি বিঘা জমিতে এক থেকে দুই হাজার টাকা লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।ব্যবসায়ী বা মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেট করে কৃষকদের ঠকাচ্ছে।
মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের বাকাতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমিনুল এহসান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকরা চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেললে দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারমান সুহেল মিয়া বলেন, সরকারি মূল্যে ধান সংগ্রহ শুরু হলে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিত হন। প্রতিবার একই দৃশ্য দেখা যায়।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ধান চাষ করে তেমন লাভবান হতে পারছেন না। সরকার যখন ধান চাল কেনে, তখন দরিদ্র কৃষকরা সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারেন না। সরকারি এসব কর্মসূচিতে বরং মিল মালিক ও মধ্যবর্তী ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়। কৃষকরা যদি সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারে তবে তারা উপকৃত হবেন।
- বিষয় :
- ধান সংগ্রহ
