ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিয়ে বার্ষিকীর ৩ দিন পর স্বামীর মৃত্যুর খবর, শোকে স্তব্ধ স্ত্রী

বিয়ে বার্ষিকীর ৩ দিন পর স্বামীর মৃত্যুর খবর, শোকে স্তব্ধ স্ত্রী
×

বুলেট বৈরাগী ও তার স্ত্রী উর্মি হীরা

কামাল উদ্দিন, কুমিল্লা

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২২:৫৪ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৪৩

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর বিয়ে বার্ষিকী ছিল গত বুধবার। সেদিন তার স্ত্রী উর্মি হীরা সামাজিকমাধ্যমে তাদের নানা মুহূর্তের ছবি পোস্ট করেন। লাল শাড়ি পরা উর্মির ছবি ঘুরছে সামাজিক মাধ্যমে। কিন্তু সেই আনন্দ আর উচ্ছ্বাস যেন হঠাৎ উর্মির জীবন থেকে উধাও! শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ি এলাকায় আইরিশ হোটেলের পাশের রাস্তা থেকে উদ্ধার হয় তার স্বামী বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত মরদেহ। 

গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়ার বুলেট বৈরাগী কুমিল্লা কাস্টমসের বিবির বাজার স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। পরিবার নিয়ে থাকতেন রাজাগঞ্জ পানপট্টি এলাকার ভুইয়া হেরিটেজ নামে ভাড়া বাসায়। ২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার মেয়ে উর্মির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের ৯ মাস বয়সী এক মেয়ে রয়েছে।

শনিবার দুপুরে বাসায় গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র সন্তান বুলেটকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন তার বাবা-মা। মেয়েকে কোলে নিয়ে বাকরুদ্ধ বুলেটের স্ত্রী উর্মি হীরা বসে আছেন একটি কক্ষে। কেবল চোখের জল ফেলছেন তিনি। কারো সঙ্গে কথা বলছেন না।  

অনেকবার প্রশ্ন করার পর কান্নাজড়িত কণ্ঠে উর্মি সমকালকে বলেন, 'তার সঙ্গে আমার রাত একটা ২৫ মিনিটে শেষ কথা হয়। এর পর তার মায়ের সঙ্গেও বেশ কয়েকবার কথা হয়। এরপর আর কোনো খোঁজ পাইনি।' 

পরিবারের সদস্যরা জানায়, বুলেট বৈরাগী ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১১ এপ্রিল বিভাগীয় প্রশিক্ষণ নিতে তিনি চট্টগ্রামে যান। শুক্রবার রাত ১১টার দিকে প্রশিক্ষণ শেষে চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে বাসে উঠেন। তার কুমিল্লার বাসায় ফেরার কথা ছিল। যাত্রাপথে পরিবারের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার কথা হয়।

নিহতের মা নীলিমা বৈরাগী সমকালকে জানান, বুলেট তার একমাত্র ছেলে। ওই রাতে সর্বশেষ ২টা ২৫ মিনিটের দিকে ছেলে ফোন করে জানায়, কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছেছে। পরে রাত আড়াইটার পর তার মোবাইল ফোনে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা কয়েকবার কথা বলেন। এরপর থেকে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাতভর খোঁজাখুঁজি করে তার সন্ধান না পেয়ে শনিবার সকালে তার বাবা সুশীল বৈরাগী কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

সুশীল বৈরাগী আহাজারি করে বলেন, 'ঘাতকরা কেন আমার বুকে ধন কেড়ে নিল। ওরা টাকা পয়সা চাইলে দিতাম। কেন আমাদের সন্তান-হারা করলো। তার স্ত্রী স্বামীহারা হলো, একমাত্র সন্তানটা বাবা হারাল।' তিনি ঘাতকদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার দাবি করেন।

ময়নাতদন্ত শেষ মরদেহ গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।  

ময়নামতি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল মোমিন জানান, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ মহাসড়কের আইরিশ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের পাশের ফুটপাত থেকে এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে। পরে দুপুর ১টার দিকে পরিবারের সদস্যরা থানায় এসে ওই মরদেহ বুলেট বৈরাগীর বলে শনাক্ত করেন। মরদেহের মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন ও মুখ রক্তাক্ত ছিল।  

সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সিরাজুল মোস্তফা সমকালকে বলেন, গভীর রাতে নগরীর টমছমব্রিজ থেকে তাকে কীভাবে মহাসড়কে নেওয়া হয়। এসব বিষয় তদন্ত করতে আশপাশের এলাকার সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। তথ্য প্রযিুক্তর সহায়তায় ঘটনার তদন্ত চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করে মরদেহ ফেলে গেছে। 

ওসি আরও বলেন, হাইওয়ে পুলিশের কাছ থেকে দুপুরের পর মরদেহ বুঝে পেয়েছি। দেরি হওয়ায় শনিবার ময়নাতদন্ত করা হয়নি, তবে রোববার সকালে ময়নাতদন্ত হবে।
 

আরও পড়ুন

×