রূপপুর প্রকল্পে দেশি-বিদেশি ২১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান
ছবি: সমকাল
পাবনা অফিস
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ২২:২৮
স্বপ্ন এখন বাস্তব। দীর্ঘ ৬৫ বছরের আকাঙ্ক্ষিত প্রকল্পের সফল সমাপ্তি হয়েছে। জ্বালানি লোডের মাধ্যমে কার্যত পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। স্থানীয়দের মতে, বাংলাদেশের মানুষের বেকারত্ব দূর করতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যাপক ভুমিকা রেখেছে।
বিগত ১০ বছরে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রায় ২১ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এদের মধ্যে ৫ হাজার রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনের নাগরিকসহ বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া দেশের প্রায় ১৬ হাজার মানুষ রূপপুরের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন দেশি বিদেশি কোম্পানিতে শ্রমিকসহ অন্যান্য পদে চাকরি করছেন। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষোভাবে এই সব পরিবারের প্রায় ১ লাখ মানুষ উপকৃত হচ্ছে। এ ছাড়া এই প্রকল্পের কারণে পাবনা অঞ্চলসহ আশপাশের এলাকার আর্থ সামাজিক ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। এ ছাড়া রূপপুর প্রকল্প ঘিরে গোটা এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নে ‘গ্রীনসিটি’ এবং পাকশী ইউনিয়নে রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে প্রকল্প অবস্থিত। এক সময় এসব এলাকার অধিকাংশ জঙ্গল চরের বালিবেষ্টিত ছিল। সেখানে তেমন কোনও বসতি ছিল না। কালক্রমে সেখানে বসতি গড়ে উঠে।
ঈশ্বরদী উপজেলার দিয়ার সাহাপুর গ্রামের শত বছরের বৃদ্ধ পিয়ার আলী সমকালকে বলেন, এক সময় সাহাপুরের গ্রীনসিটি এলাকায় মানুষ ভয়ে আসতো না। আমরা শুনছি এখানে বাঘ, চিতাবাঘ, সাপ বিচ্ছুর অভয়ারণ্য ছিল। ১৯৬১ সালে রূপপুর প্রকল্পের জন্য সাইট সিলেকশন হলে এখানে কয়েকটি দালান করা হয়। কিন্তু সেখানে কেউ বসবাস না করায় পরে সেসব ভবনকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ফলে লোকজনের চলাচল একদমই ছিল না। সেখানে বিল্ডিংয়ের উপর গাছ গজিয়ে জঙ্গলে পরিণত হয়।
গ্রীনসিটির সামনে রাশিয়ান নাগরিকসহ বিদেশিরা কেনাবেচা করছেন। নানা জিনিসের দরদাম করছেন। অনেক সময় দোভাষীর মাধ্যমে তারা দরদাম করে থাকেন।
বিদেশিদের আকৃষ্ট করতে তারা তাদের দোকানের সামনে রাশিয়ান ভাষায় সাইন বোর্ড দিয়েছেন। কেউ রাশিয়ান ভাষা শিখছে। আবার কেউ বই কিনে রাশিয়ান ভাষা আয়ত্বে আনার চেষ্টা করছে।

রাশিয়ায় পড়াশুনা করা যুবক হিমেল হোসেন (৩৫) গ্রীনসিটির সামনে দোকানে দোভাষীর চাকরি নিয়েছেন। দোকানের মালিক মো. সবুজ চৌধুরী সমকালকে বলেন, এই দোভাষীর কারণে তার বেচাবিক্রি দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রাশিয়ানরা দোভাষীর সঙ্গে খুবই ঘনিষ্টভাবে কথা বলে থাকেন।
অ্যালেক্সি (৪০) নামের এক রাশিয়ান নাগরিক ৫ বছর এই গ্রীনসিটিতে বসবাস করছেন। রূপপুর পারমাবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে একটি রাশিয়ান কোম্পানির প্রকৌশলী তিনি।
অ্যালেক্সি (৪০) দোভাষীর মাধ্যমে সমকালকে বলেন, এখানকান মানুষজন খুব ভালো। তারা তাদের খুব সহযোগিতা করে থাকে। কোনও সময় প্রতারণা করে না। তিনি ৫ বছর এই গ্রীনসিটিতে বসবাস করছেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম প্রকল্প পরিচালক (সাবেক) ড. শৌকত আকবর বিভিন্ন কারিগরি বিষয় তুলে ধরে সাংবাদিকদের বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু এই এলাকা নয় গোটা বাংলাদেশের আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি নিয়ে দেশে যখন ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা সেই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে জ্বালানিক্ষেত্রে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক। দক্ষ জনবল দিয়ে সঠিক ব্যবহারে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান ঘটাতে পারে এই প্রকল্পটি। এটি বাস্তবায়ন হলে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্চ মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশ।
তিনি আরও বলেন, কার্বনমুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে গত ২৮ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (এনপিপি) ইউনিট-১-এ নতুন জ্বালানি লোডিং শুরু হয়।
প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার ঈশ্বরদীতে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এরপর নানা ধাপ পেরিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে পারে রূপপুরের প্রথম ইউনিট। এর মাধ্যমে পারমানবিক শক্তি ব্যবহারকারীর আন্তর্জাতিক দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ।
- বিষয় :
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
