ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

ছাড়তে চেয়েছিলেন দস্যুতা পরিণতি নিয়ে রহস্য

ছাড়তে চেয়েছিলেন দস্যুতা পরিণতি নিয়ে রহস্য
×

আলামিন

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

অজ্ঞাত জায়গায় গত ১৪ এপ্রিল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন সুন্দরবনে সক্রিয় ‘আলামিন বাহিনী’র প্রধান আলামিন। স্ত্রীর পীড়াপীড়ি ও সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো অপরাধে না জড়ানোর সিদ্ধান্তও নেন। দেড় বছর বয়সী যমজ সন্তানকে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞাও করেন, অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করবেন। বিষয়টি দলের সদস্যদের জানাতে আলামিন ১৬ এপ্রিল যান সুন্দরবনে। এরপর থেকে তাঁর খোঁজ মিলছে না। যে নম্বর থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, সেটিও বন্ধ।

এদিকে গত ১৭ এপ্রিল এলাকায় খবর আসে, আলামিনের লাশ নদীতে ভাসতে দেখা গেছে। এতে অনেক জায়গায় মিষ্টি বিতরণ হয়েছে বলেও শোনা যায়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, সেদিন কোনো বনদস্যুর মৃত্যুর তথ্য বা লাশ উদ্ধারের খবর জানা নেই তাদের।
আলামিন খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন লাগোয়া মহেশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দা। ২০১৮ সালে দস্যুতা ছেড়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। পরে বাগদা চিংড়ির রেণু ব্যবসা শুরু করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সুন্দরবনে ফের দস্যুতা শুরু হলে বনদস্যু জাহাঙ্গীরের দলে যোগ দেন আলামিন। পরে নিজেই দল গঠন করেন। তাঁর স্ত্রী রাবেয়া খাতুনের ভাষ্য, এলাকার এক অপরাধীর কাছে অপমানিত হয়েছিলেন আলামিন। এর প্রতিশোধ নিতেই তিনি ফের দস্যুতায় জড়িয়ে পড়েন। পরে ভুল বুঝতে পেরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়েই নিজ দলের সদস্যদের হাতে নিহত হয়েছেন তাঁর স্বামী। 

রাবেয়া খাতুন বৃহস্পতিবার বলেন, এত কিছুর পরও তাঁর স্বামী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, জীবনে যা-ই ঘটুক, দস্যুতায় আর ফিরবেন না। দুই ছেলের মাথায় হাত রেখে প্রতিজ্ঞা করে বেরিয়েছিলেন আত্মসমর্পণের জন্য। এখন শুনতে পাচ্ছেন, তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। 

আলামিনের ভাই ইলিয়াস আলীর ভাষ্য, এলাকার চিহ্নিত হরিণ শিকারি হান্নান সরদারের সঙ্গে বিরোধ ছিল তাঁর ভাইয়ের। দস্যুতা ছেড়ে আত্মসমর্পণের পর থেকে হান্নান নানা প্রলোভনে তাঁকে (আলামিন) দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এই ফাঁদে পা না দিয়ে উল্টো তাদের কাজের বিরোধিতা শুরু করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আলামিনকে নির্জন জায়গায় ডেকে নিয়ে গাছে বেঁধে বেধড়ক মারধর করে শিকারি চক্রটি। এতে তাঁর একটি পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকদিন পর আলামিনের সঙ্গে তর্কাতর্কির পর একটি স্লুইসগেটের ওপর থেকে তাঁকে লাথি মেরে খালে ফেলে দেয় হরিণ শিকারিরা। এসব ঘটনায় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন আলামিন। কিন্তু প্রভাবশালী শিকারি চক্রের সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না। সুন্দরবনে ফের দস্যুতা শুরু হলে জাহাঙ্গীরের দলে যোগ দেন। এরপর থেকে ওই হরিণ শিকারিকে সুন্দরবনে পেয়ে একইভাবে বেঁধে পেটানোর পর পায়ে গুলি করে ছেড়ে দেন আলামিন। পরে জাহাঙ্গীরের বাহিনী থেকে বেরিয়ে আলাদা দল গঠন করেন। সুন্দরবনের ব্যবসায়ী ও জেলেদের কাছে তাঁর দল ‘আলামিন বাহিনী’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। দলের সদস্য ছিল ছয়জন। ঘটনার পর থেকে তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। 

বাবা সোবহান সরদার বলেন, ‘ছাওয়ালটা (আলামিন) সৎ পথে ফিরে আসলো, আবার তাকে অসৎ পথে যাতি বাধ্য করা হলো। সেখান থেইকাও ফিরতি চাইলো। কিন্তু আর ফেরা হলো না। লোক মুখি শুনতি পাই, কারা তাকে মাইরে গাঙের পানিতি ভাসায়ে দেছে। শুনিছি মানুষ পাপের পথ থেইকে ফিরতি চাইলে আল্লাহতায়ালা তাকে মাফ করেন। ভালো পথে ফিরি আসতি চাইয়ে আমার ছাওয়ালটাকে যদি কেউ মাইরে ফেলাই থাকে, তাইলে তার লাশটা আমরা ফেরত চাই।’ 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে আলামিনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তাই সঠিক তথ্য দিতে পারেননি। 
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণের আগে বনদস্যু শরীফ বাহিনীর সদস্য ছিলেন আলামিন। তখন তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা ছিল। আত্মসমর্পণের পর তার নিষ্পত্তি হয়ে যায়। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর কয়রা থানায় আলামিনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন হান্নান সরদার। এতে আরও পাঁচজনকে আসামি করা হয়। হান্নান সরদার গত ১৬ এপ্রিল জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে কয়রা থানায় আলামিনের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
কয়রা থানার ওসি শাহ আলম গতকাল শনিবার বলেন, সুন্দরবনের সোনামুখী খালে বনদস্যু আলামিনের লাশ ভাসার খবর শুনেছিলেন। বন বিভাগের সহায়তায় আশপাশে তল্লাশি চালানো হয়। কিন্তু কোথাও লাশ পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া ওই সময়ে সুন্দরবনে অবস্থানকারী কোনো জেলে এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।

আরও পড়ুন

×