ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জামালপুরে ৪১% সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই

জামালপুরে ৪১% সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই
×

জামালপুর পৌর শহরের চালাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে বসে আছে একজন শিক্ষার্থী। ১৫ এপ্রিল দুপুর ১২টার দিকে তোলা সমকাল

আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর দেড়টা। জামালপুর পুলিশ লাইন্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেল দুজন করে শিক্ষার্থী বসে আছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কক্ষে। পঞ্চম শ্রেণির কক্ষে পাওয়া গেল তিনজন শিক্ষার্থী। গত ১৫ এপ্রিলের চিত্র এটি। প্রধান শিক্ষকের অভাবে বেহাল হয়ে পড়েছে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম। প্রায় ৩১ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। সবশেষ ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পড়ে সহকারী শিক্ষক সুরাফীয়া আক্তারের কাঁধে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুরাফীয়া আক্তার জানান, ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি শূন্য হয় প্রধান শিক্ষকের পদ। এরপর থেকেই চলছে ভারপ্রাপ্ত দিয়ে। তিনি দাপ্তরিক কাজে গেলে তিনজন শিক্ষক দিয়ে চলে পাঠদান। ছাত্রছাত্রী কম উপস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ লাইন্সের এক সড়কেই রয়েছে ১৪-১৫টি সরকারি-বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসা। তাছাড়া গত ১৫ এপ্রিল ছিল পুলিশ লাইন্স মাঠে কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষা।

একই দিন দুপুর ১২টায় শহরের চালাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আওলিয়া আক্তার অফিস কক্ষে টেবিলে মাথা রেখে ঝিমাচ্ছেন। সব ক্লাস মিলিয়ে ৩৫ জন শিক্ষার্থী দেখা গেলেও পঞ্চম শ্রেণিতে পাওয়া গেল একজন। আওলিয়া আক্তার জানান, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হয়। এরপর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ সংখ্যা ছয়টি। শিক্ষার্থী ১২৯ জন। পাঁচটি শ্রেণিকক্ষের মধ্যে দুটি ব্যবহারের অযোগ্য। দরজা-জানালা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই অস্থায়ী দুটি শ্রেণিকক্ষে পানি জমে যায়। নেই প্রয়োজনীয় বেঞ্চ। তাই মেঝেতে বসেই চলে পাঠদান। তিনি জানান, তিনি দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকলে তাঁর ক্লাস থাকে শিক্ষক শূন্য।
কেবল এই দুটিই নয়, জামালপুর জেলার ৪৭৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে চলছে। এ ছাড়া জেলায় সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ২৯৮টি। সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি না দেওয়া ও প্রধান শিক্ষক পদে সরাসরি নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় জেলার প্রায় ৪১ শতাংশ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে। সহকারী শিক্ষক না থাকায় কমসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান কার্যক্রম।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, জামালপুরের সাতটি উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে এক হাজার ১৬৪টি। এর মধ্যে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্বসহ কর্মরত আছেন ৬৯১ জন। ৪৭৩টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ ২৪৪টি, শূন্য ১০১টি। ইসলামপুর উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ ১৭৭টি, শূন্য ৬৯টি। দেওয়ানগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের পদ ১৩৯টি, শূন্য ৪৫টি। বকশীগঞ্জ উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ ১১০টি, শূন্য ৪৪টি। মেলান্দহ উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ ১৫৯টি, শূন্য ৬১টি। মাদারগঞ্জে প্রধান শিক্ষকের পদ ২০১টি, শূন্য ৮৭টি এবং সরিষাবাড়ী উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের পদ ১৩৪টি, শূন্য ৬৬টি।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ২০১ জন সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৪ সালের মার্চ মাসের আগ পর্যন্ত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির মাধ্যমে জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে সিনিয়র সহকারী শিক্ষকদেরই পদোন্নতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ দেওয়া হতো। ২০১৪ সালের মার্চ মাসে প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা ঘোষণার ফলে বিভাগীয় পদোন্নতি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তখন থেকে প্রতিনিয়ত প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হতে থাকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে।
জামালপুর পৌর শহরের আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বেহাল প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র। একাধিক সহকারী শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে দাপ্তরিক ও সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা অফিসে যেতে হয়। তখন সহকারী শিক্ষকরা সঠিকভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে পারেন না।
১৫ এপ্রিল দুপুর ২টার দিকে খুপীবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায় সহকারী শিক্ষক সাদিয়া আফরিন ও দিলরুবা সুলতানাকে। বিদ্যালয়টিতে প্রায় এক বছর ধরে প্রধান শিক্ষক নেই। সাদিয়া আফরিন জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান চৌধুরী বৃত্তি পরীক্ষার দায়িত্বে। সহকারী শিক্ষক রহিমা খাতুন চিকিৎসা সংক্রান্ত ছুটিতে, আরেক সহকারী শিক্ষক আছমা আক্তার আছেন নৈমিত্তিক ছুটিতে।

শিক্ষার্থীর অভিভাবক আশরাফ আলী বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে বেঘাত ঘটছে।
বিকেল ৩টার দিকে তীর্থ সত্যপীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, তিনজন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন। সহকারী শিক্ষক আজমিয়া ইয়াসমিন বলেন, তিন বছর ধরে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত আছেন নাসিমা খাতুন। তাঁর স্বামী অসুস্থ থাকায় তিনি দুই দিনের ছুটিতে আছেন। আর সহকারী শিক্ষক তানজিলা আফরিনের ছেলেকে বিড়ালে কামড় দেওয়ায় ভ্যাকসিন দিতে তিনিও এক দিনের ছুটি নিয়েছেন। সহকারী শিক্ষকদের ভাষ্য, পাঠদান ছাড়াও প্রধান শিক্ষককে নানা দায়িত্ব পালন করতে হয়। সেই কাজ সহকারী শিক্ষকের ওপর পড়লে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি হয়।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চন্দ্রা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সহকারী শিক্ষক শামীমা আক্তার শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাঠের গাছতলায় কাব স্কাউটের প্যাক মিটিং ক্লাস নিচ্ছেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রেহানা আক্তার বিদ্যালয়ে না থাকায় সেখানেই কথা হয় শামীমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, ২০২৪ সালের মে মাসে প্রধান শিক্ষক ওহিদুল হক আবসরে যান। এরপর থেকেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য।

রেলওয়ে কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রায় ১০ মাস ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে আছেন শ্রিপা বসাক। তাঁর ভাষ্য, তিনি নিজেও তিনটি করে ক্লাস নেন। দাপ্তরিক কাজে এখন অনেক সময় দিতে হয়। এতে তাঁর ক্লাস নিতে হয় অন্য শিক্ষক দিয়ে।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) জেলা সভাপতি শামিমা খান বলেন, স্কুল আছে, শিক্ষক নেই। ক্লাস আছে, পড়াশোনা নেই। এভাবেই চলছে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। জামালপুরে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় সাধারণ শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নেই। সব শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক পদায়ন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী আহসানের ভাষ্য, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য ১৩৬ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তারা যোগদান করলে শূন্য পদ কমে আসবে।

আরও পড়ুন

×