কুষ্টিয়ার দৌলতপুর
ইউরিয়ার বস্তায় ২০০ টাকা ডিএপিতে ৫৮০ টাকা বেশি
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৮:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
চার বিঘা জমিতে পাট বুনেছেন দৌলতপুরের আমদহ গ্রামের স্বপন হোসেন। তাঁর জমিতে দেওয়ার জন্য গতকাল শনিবার ডিএপি সার আনতে গিয়েছিলেন উপজেলার পিয়ারপুর ইউনিয়নের বিসিআইসির সার ডিলার নুরুল ইসলাম নুরুর কাছে। ডিলার জানান, ডিএপি সার নেই। ইউরিয়া দেওয়া যাবে। সরকার নির্ধারিত দরে কেজিপ্রতি ২৭ টাকায় ২০ কেজি সার কেনেন স্বপন। পরবর্তী সময় বেশি দামে বাইরে থেকে প্রয়োজনীয় সার কিনতে হয় তাঁকে।
স্বপন হোসেনের মতো উপজেলার শত শত চাষি বিপাকে পড়েছেন হঠাৎ করেই ডিএপি ও ইউরিয়া সারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায়। খরিফ-১ (বর্ষাকালীন) মৌসুমের পাট ও সবজি আবাদে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। এমন সময়ে সারের বাড়তি দাম কৃষকদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ।
গত বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার উপজেলার কয়েকটি বাজার ঘুরে বাড়তি দামে সার বিক্রির চিত্র দেখা গেছে। ইউরিয়া সারের বস্তার (৫০ কেজি) খুচরা দাম সরকার নির্ধারিত করে দিয়েছে এক হাজার ৩৫০ টাকা। কোনো বাজারে এই সার বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫৫০ টাকা, কোথাও এক হাজার ৬২০ টাকা। ডিএপি সারের দাম এক হাজার ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিক্রি হচ্ছে ১৬৩০ থেকে ১৭৫০ টাকায়। সে হিসাবে প্রতি বস্তা ইউরিয়ায় কৃষককে ২০০ থেকে ২৭০ টাকা ও ডিএপি সারে ৫৮০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন, পাটের জমিতে এখন সার প্রয়োজন। হঠাৎ দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাবে। কৃষকের অবস্থা এমনিতেই ভালো নয়। তার ওপর সারের দাম বৃদ্ধি তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসের সম্মিলিত উদ্যোগে সারের বাজার নিয়ন্ত্রণের দাবি তোলেন তারা।
বৃষ্টির পর পাটের জমিতে সারের প্রয়োজন হয় বলে জানান হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের গাছেরদিয়াড় গ্রামের কৃষক রাজিবুল। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে স্থানীয় হাসান আলীর দোকানে সার কিনতে যান। তাঁর কাছ থেকে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের দাম রাখা হয় ৩২ টাকা। কেজিপ্রতি তাঁকে পাঁচ টাকা বেশি দিতে হয়েছে।
পিয়ারপুরের চাষি মহন হোসেন বলেন, দীর্ঘ খরার পর বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে পাটের উৎপাদন ভালো করতে সারের চাহিদা বেড়েছে। ইউরিয়া সারের কেজিপ্রতি সরকার নির্ধারিত দাম ২৭ টাকা। কিন্তু শনিবার সকালে তিনি আল্লাহর দরগা বাজারের শাহাজ উদ্দিনের দোকান থেকে ৩২ টাকা দরে সার কিনেছেন। তিনি মনে করেন, মৌসুমের শুরুতে সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে না আনলে কৃষককে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। বিশেষ করে তাদের মতো নিম্ন আয়ের চাষির জন্য এটি ভয়াবহ সংকট হিসেবে দেখা দেবে।
এ বিষয়ে কথা হয় কয়েকজন খুচরা সার ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তারা বলছেন, ডিলারের কাছ থেকে বাড়তি দামে সার কিনতে হচ্ছে। যে কারণে তারাও বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। তাদের অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাড়তি মুনাফার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি দাম বৃদ্ধির জন্য কৃষি অফিসের উদাসীনতাও দায়ী।
শনিবার আল্লার দরগা বাজারের সার ব্যবসায়ী শাহাজ উদ্দিনের দোকানে গিয়ে বেশি দামে সার বিক্রির সত্যতা মেলে। এ সময় তিনি বলেন, সারের ডিলার নুরুল ইসলাম নুরুর কাছ থেকে তিনি সার কিনে এনে বিক্রি করেন। কিন্তু ডিলারের কাছে তিনি সার পাচ্ছেন না। এ কারণে বেশি দামে অন্য জায়গা থেকে সার কিনতে হচ্ছে। তাই তিনিও বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। শাহাজ উদ্দিন স্বীকার করেন, বেশি দামে সার বিক্রি করা ঠিক হয়নি। আর বাড়তি দামে সার বিক্রি না করার আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে পিয়ারপুর ইউনিয়নের বিসিআইসির সার ডিলার নুরুল ইসলাম নুরুর সঙ্গে গতকাল শনিবার রাত ৮টার দিকে কথা হয় সমকালের। তিনি দাবি করেন, তাঁর গুদামে সার নেই। সারের জন্য ডিও করা হয়েছে। পরিবহনের জন্য দুয়েক দিন দেরি হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীনের ভাষ্য, দৌলতপুরে সারের কোনো সংকট নেই। প্রতি মাসেই চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন ডিলাররা। বাজার পরিস্থিতিতেও নজরদারি করছেন। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি দপ্তরের মাধ্যমে নিয়মিত বাজার মনিটর করা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামের বাড়তি দামে সার বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
- বিষয় :
- ইউরিয়া
