ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৫৪ বছর পর ফিরে এলেন সাগরে নিখোঁজ জেলে

৫৪ বছর পর ফিরে এলেন সাগরে নিখোঁজ জেলে
×

ফিরে আসা ছৈয়দ আহাম্মদ। ছবি: সমকাল

হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ১৪:০২ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৮:২৩

সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে নিখোঁজ হওয়ার ৫৪ বছর পর অবিশ্বাস্যভাবে নিজ গ্রামে ফিরে এসেছেন ছৈয়দ আহাম্মদ নামের এক জেলে। নোয়াখালীর হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের এমপির পুল সংলগ্ন ফজলি বাড়িতে ঘটেছে এই ঘটনা। 

পরিবার ও স্বজনরা যাকে মৃত ভেবে এতকাল চোখের জল ফেলেছেন, সেই মানুষটির হঠাৎ ফিরে আসাতে পুরো নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ফিরে আসা মানুষটির নাম ছৈয়দ আহাম্মদ। মৃত ধন মিয়ার ছেলে তিনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, কণ্ঠনালীতে করা হয়েছে অপারেশন, শরীরে নানা অসুস্থতা, তবু চোখে-মুখে যেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আপন ঠিকানায় ফেরার এক শান্তির ছাপ।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫৪ বছর আগে কুতুবদিয়া এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে ভয়াবহ ট্রলারডুবির কবলে পড়েন ছৈয়দ আহাম্মদ। উত্তাল সাগরে মুহূর্তেই ছিটকে যায় জেলেরা। তাদের মধ্যে অনেকে ফিরে এলেও ছৈয়দ আহাম্মদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পরিবার ধরে নেয় তিনি হয়তো আর বেঁচে নেই। তখন তার স্ত্রী ছামনা খাতুনের কোলজুড়ে ছোট্ট শিশু সন্তান আকরাম। বাবার মুখ না দেখেই বড় হতে থাকে সেই সন্তান।

পরিবারের দাবি, ট্রলারডুবির পর কোনোভাবে খড়কুটো আঁকড়ে ভেসে ভারতের অজ্ঞাত এক এলাকায় পৌঁছে যান ছৈয়দ আহাম্মদ। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ অনিশ্চয়তার জীবন।

বছরের পর বছর তিনি বিভিন্ন মসজিদ, মাজার ও পথে-প্রান্তরে কাটিয়েছেন। জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে ভবঘুরের মত পরিচয়হীন আজমীর শরীফে। সম্প্রতি ভারতের হাওড়া স্টেশন এলাকায় দুষ্কৃতকারীদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারান তিনি। পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ আইনগত প্রক্রিয়া শেষে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

এরপর ধীরে ধীরে পথ চিনে, স্মৃতির টানে, বহু বছরের পুরোনো ঠিকানার খোঁজে একদিন তিনি পৌঁছে যান হাতিয়ায় নিজের পৈতৃক বাড়িতে।

গত মঙ্গলবার দুপুরে বাড়িতে এসে নিজের পরিচয় দেন বৃদ্ধ ছৈয়দ আহাম্মদ। প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি। পরে তার সহপাঠী মুন্সি সারেং, চাচাতো ভাই গেদু মিয়া, সহোদর আবুল খায়ের ওরফে জমিদারসহ কয়েকজন প্রবীণ তাকে শনাক্ত করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আলফাজ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘এত বছর পর আল্লাহ তাকে জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এটা আমাদের জন্যও আনন্দের বিষয়। মানুষটা যেন জীবনের শেষ সময়ে আপনজনদের সান্নিধ্য পায়, এটাই চাই।’ 

ছৈয়দ আহাম্মদের ছেলে আকরাম জানান, জন্মের পরপরই বাবা নিখোঁজ হন। এতদিন তিনি শুধু মানুষের মুখে বাবার গল্প শুনেছেন। এবার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সত্যিকারের বাবাকে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেলেন। তবে এই ফিরে আসাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে পারিবারিক টানাপোড়েনও। 

আকরামের অভিযোগ, কয়েকজন স্বজন তাকে বাবার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে গড়িমসি করছেন। এছাড়া ছৈয়দ আহাম্মদের সঙ্গে থাকা অর্থ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

এ বিষয়ে হাতিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. কবির হোসেন বলেন, ৫৪ বছর পর একজন জেলে ফিরে আসার খবর পেয়েছি। এটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনরা সহযোগিতা চাইলে আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। 

আরও পড়ুন

×