রাজশাহী বিভাগ
ভারতীয় গরু আসা বন্ধের পর ঘরে ঘরে পশু পালন
রাজশাহীতে শিক্ষিত বেকার ছেলেরা গরুর খামার গড়ে ভালো আয় করছেন। কোরবানির ঈদ তাদের উপার্জনের প্রধান মৌসুমে পরিণত হয়েছে। গতকাল রোববার নগরীর বুধপাড়া খামার থেকে তোলা। ছবি: সমকাল
সৌরভ হাবিব, রাজশাহী
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:৩৬ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১২:৪৬
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন মাইনুল হাসান। তাঁর বড় ভাই মেহেদী হাসান পড়েছেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে। তবে উচ্চশিক্ষিত এই দুই ভাই প্রথাগত কোনো চাকরিতে যাননি। ব্যবসার পাশাপাশি তারা গড়ে তুলেছেন গবাদি পশুর খামার। বর্তমানে তাদের খামারে ৯টি গরু রয়েছে।
মাইনুল ও মেহেদীর মতো এমন হাজারো শিক্ষিত যুবকের হাত ধরে রাজশাহী বিভাগে গত এক যুগে পশু পালনে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। একসময় কোরবানির পশুর জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও সীমান্তে কড়াকড়িতে ভারতীয় গরু আসা বন্ধ হওয়ার পর থেকে ঘরে ঘরে খামার গড়ে উঠেছে। এতে একদিকে যেমন শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিও শক্তিশালী হচ্ছে।
নিজের উদ্যোগ নিয়ে মাইনুল হাসান বলেন, ‘আশা করছি ৯টি গরু বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা লাভ হবে। ভারত থেকে গরু না আসায় দেশে অনেক খামার ও খামারি গড়ে উঠেছে। ভারত থেকে গরু এলে দেশের খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’
স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ১৮ লাখ পশু যাবে সারাদেশে
রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের আট জেলায় এ বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে ৪৩ লাখ পাঁচ হাজার ৬২৮টি গবাদি পশু। অথচ এই বিভাগে পশুর চাহিদা রয়েছে ২৪ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯টি। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৫৩৯টি উদ্বৃত্ত পশু ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বিভাগে পশু উৎপাদনে এখন শীর্ষে রয়েছে নওগাঁ জেলা। সেখানে চাহিদা তিন লাখ ৮৬ হাজার ৮৩৭টি হলেও পশু প্রস্তুত আছে সাত লাখ ৯৭ হাজার ৫১৫টি। ফলে জেলাটিতে উদ্বৃত্ত পশুর সংখ্যা চার লাখ ১০ হাজার ৮৭৮। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বগুড়ায় চার লাখ ৪৭ হাজার ৫৮০টি চাহিদার বিপরীতে প্রস্তুত আছে সাত লাখ ৫৬ হাজার ৫০৭টি পশু। এ ছাড়া সিরাজগঞ্জে ছয় লাখ ১৭ হাজার ৭২০টি, পাবনায় ছয় লাখ ৫৩ হাজার ৫৮৮টি এবং নাটোরে চার লাখ ৭৫ হাজার ৪৩৭টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অন্যান্য জেলার মধ্যে জয়পুরহাটে তিন লাখ ২৬ হাজার ৫৭৩টি, রাজশাহীতে চার লাখ ৬৩ হাজার ১১টি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে দুই লাখ ১৫ হাজার ২৪৪টি পশু হাটে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে।
বিভাগের আট জেলায় বর্তমানে দুই লাখ ২৪ হাজার ৪৮৩ জন খামারি রয়েছেন, যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই বিশাল পশুবহর তৈরি হয়েছে। বিভাগে সবচেয়ে বেশি লালন-পালন করা হয়েছে আট লাখ ৩৩ হাজার ৭৮৩টি ষাঁড়। এ ছাড়া রয়েছে দুই লাখ ৯ হাজার ৯৪০টি বলদ, তিন লাখ ৬৩ হাজার ৮৯০টি গাভি, ২০ হাজার ৬৬১টি মহিষ এবং ২৪ লাখ ৯৮ হাজার ২৩৮টি ছাগল। এর বাইরেও তিন লাখ ৭৮ হাজার ৭৩০টি ভেড়াসহ অন্যান্য পশু রয়েছে।
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক আনন্দ কুমার অধিকারী বলেন, ‘গত ১০ থেকে ১২ বছর ধরে ভারতীয় পশু আমদানির প্রয়োজন হয় না। দেশের পশুতেই আমাদের চাহিদা পূরণ হয়। এবারও ভারতীয় পশু পাচার হয়ে আসার কোনো সুযোগ নাই। কারণ সীমান্তে বিএসএফ কঠোর। ভারত সরকারও গরু পাঠানোর বিরুদ্ধে। আর আমাদেরও দেশের পশুতেই চাহিদা মিটবে।’
খাবারের দাম নিয়ে শঙ্কা ও ন্যায্যমূল্যের প্রত্যাশা
উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর হাট হিসেবে পরিচিত রাজশাহী সিটি হাটে এখন শেষমুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় হাটগুলোয় প্রচুর ভারতীয় সাদা ‘বলডার’ গরু উঠত। কিন্তু চোরাচালান বন্ধ হওয়ার পর দেশীয় খামারিরাই এখন বড় ভরসা। তবে পশুখাদ্যের বাড়তি দাম নিয়ে চিন্তিত সাধারণ খামারিরা।
পবা উপজেলার খামারি নজরুল বলেন, ‘গবাদি পশু পালনে খরচ বেড়েছে। সব খাবারের দাম বেশি। ভারতীয় গরু এলে দাম পাব না। তাই ভারতীয় গরু যেন না আসে। তাহলে ন্যায্যমূল্য পাব।’
একই সুর শোনা গেল নওহাটা এলাকার খামারি নওশাদ আলীর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘কোরবানি সামনে রেখে প্রতিবছরই কয়েকটা গরু পালন করি। খাবারের দাম বেশি। তবে বাজার ভালো হলে লাভবান হব।’
চাহিদার চেয়ে ১৫ হাজার বেশি পশু প্রস্তুত
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজশাহীর বিভাগের পাশাপাশি রাজবাড়ী জেলাতেও এবার কোরবানির পশুর উদ্বৃত্ত উৎপাদন হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, রাজবাড়ীর পাঁচ উপজেলার ছোট-বড় আট হাজার ৮০০ খামারে এবার প্রায় ৭০ হাজার কোরবানির পশু প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলায় পশুর চাহিদা রয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার। অতিরিক্ত ১৫ হাজার পশু ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন খামারিরা।
রাজবাড়ী সদর ও বালিয়াকান্দি উপজেলার বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা গেছে, খামারিরা শেষমুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। গবাদি পশুকে সুস্থ রাখতে খামারে ফ্যান ও জেনারেটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বালিয়াকান্দির থ্রিএস এগ্রো ফার্মের মালিক বজলুর রশিদ স্বপন ও খামারকর্মী রাকিবুল ইসলাম জানান, প্রাকৃতিক উপায়ে তারা পশু মোটাতাজা করছেন। তবে গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এবার উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়েছে। এই অবস্থায় খামারিদের প্রধান দুশ্চিন্তা ভারতীয় গরু আমদানির শঙ্কা নিয়ে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, খামারিরা স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু পালন করেছেন এবং পশুর সুস্থতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাজারে পশুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হলে খামারিরা লাভবান হবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
