ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘পোলারে অনেক কষ্টে বিদেশ পাঠাইছিলাম, ক্যান যুদ্ধে গেল’

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত ময়মনসিংহের যুবক

‘পোলারে অনেক কষ্টে বিদেশ পাঠাইছিলাম, ক্যান যুদ্ধে গেল’
×

আবদুর রহিম

 ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ | ০৯:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

মা-বাবার কষ্ট দূর করতে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন আবদুর রহিম (৩০)। তিন মাস আগে বাড়িতে বলেছিলেন, ভালো বেতনে বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন চাকরিতে যোগ দেবেন। পরে জানা যায়, রুশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে ছিলেন আবদুর রহিম। এক মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে ১ মে কাজে যোগ দেন। পরদিনই ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে ড্রোন হামলায় প্রাণ হারান ময়মনসিংহের এই যুবক।
গত সোমবার সন্ধ্যায় মৃত্যুর খবর পরিবারের কাছে পৌঁছানোর পর থেকে মাতম চলছে। আবদুর রহিম ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুটিজানা নামাপাড়া গ্রামের আজিজুল হকের ছেলে। বড় ছেলেকে হারিয়ে শোকে কাতর বাবা। রহিমের ছবি বুকে ধরে সারাক্ষণ কাঁদছেন মা রমিছা খাতুন।

স্থানীয় একটি মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক আজিজুল হক বলেন, ‘অনেক কষ্টে ছেলেকে বিদেশ পাঠাইছিলাম। কী মনে কইরা সে সেনাবাহিনীতে যোগ দিল, আমরা জানি না। এক মাস ট্রেনিং কইরা যুদ্ধে যেই দিন গেল, সেই দিনই নাকি মারা গেছে। এখন ছেলের লাশ ফেরত চাই।’
গতকাল আজিজুল হকের বাড়িতে দেখা যায়, টিনশেডের দুটি ভাঙাচোরা ঘর। পুরো বাড়িতে শোকাবহ পরিবেশ। একটি ঘর থেকে ভেসে আসছিল রমিছা খাতুনের আহাজারি। তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। 

আজিজুল হক ও রমিছা খাতুন দম্পতির তিন ছেলের মধ্যে বড় আবদুর রহিম। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঋণ ও জমি বন্ধকের টাকায় সিঙ্গাপুরে যান তিনি। সেখানে সাত বছর ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করেন। দেশে ফিরে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে ২০২৪ সালের ৭ ডিসেম্বর রাশিয়ায় যান। পরিবারের লোকজন জানতেন, সেখানেও ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করছেন রহিম। সবাই জানতেন, রাশিয়ায় যাওয়ার কিছুদিন পর তিনি অনিয়মিতভাবে টাকা পাঠাতে শুরু করেন। তিন মাস আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন চাকরির কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা নেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নতুন কাজে যোগ দেওয়ার পর এক মাস ধরে মা-বাবার সঙ্গে রহিমের সরাসরি কথা হতো না। নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা বলতেন তিনি। তবে দুই ছোট ভাইয়ের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল। 

এর আগে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রুশ সেনাবাহিনীতে একই ক্যাম্পে থাকা আবদুর রহিমের বন্ধু লিমন দত্ত ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের তরুণ রিয়াদ রশিদের নিহতের খবর তাঁর পরিবারকে দেন। নরসিংদীর এই যুবক জানান, ২ মে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেন সীমান্তে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দুই বাংলাদেশি ও এক নাইজেরিয়ান সৈন্য নিহত হন। আহত হন তিনজন। হামলায় লিমন দত্ত নিজেও একটি পা হারিয়ে সেখানকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, ‘রিয়াদের সঙ্গে রহিমও নিহত হয়েছেন।’ 

এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর চুক্তিভিত্তিক সদস্য হিসেবে ইউক্রেনে যুদ্ধে গিয়ে প্রাণ হারান ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার যুবক ইয়াসিন (২২)।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কত বাংলাদেশি মারা গেছেন, তার প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি। তবে গত মার্চ মাসে ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন জানায়, এ পর্যন্ত ১০৪ বাংলাদেশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়েছেন। আর এই যুদ্ধে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৩৪ বাংলাদেশি। 

আরও পড়ুন

×