ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এক মুঠো ধানের জন্য নারীর যুদ্ধ

‘সকাল থেইক্কা ধান উলডাইতেছি, না হুগাইয়লে খাইমু কী?’

‘সকাল থেইক্কা ধান উলডাইতেছি, না হুগাইয়লে খাইমু কী?’
×

ছবি: সমকাল

মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ১৭:০৬ | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ | ১৭:৩৩

টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে বিপর্যস্ত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনে অবশেষে দেখা মিলেছে রোদের। আর সেই রোদকে কাজে লাগিয়ে এক মুঠো ধান বাঁচাতে নীরব যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের নারীরা।

মঙ্গলবার সকাল থেকে অষ্টগ্রামের বিভিন্ন খলা, অলওয়েদার সড়কের দুই পাশ ও উঁচু স্থানগুলোতে শত শত নারীকে ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত দেখা যায়। কেউ ধান উল্টে দিচ্ছেন, কেউ বাতাসে ঝাড়ে ময়লা পরিষ্কার করছেন, আবার কেউ শুকনো ধান বস্তাবন্দি করছেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের এই নিরলস পরিশ্রম যেন হাওরপাড়ের সংগ্রামী জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।

অষ্টগ্রামের দেওঘর, কলমা, কাস্তুল ও আবদুল্লাহপুর এলাকার খলাগুলো ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই ধান রক্ষার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয়রা। অনেক নারী শিশুদের নিয়েই খলায় এসেছেন। ঘরের কাজ সামলে এখন তাদের একটাই লক্ষ্য, যেভাবেই হোক ধান শুকিয়ে ঘরে তোলা।

‎দেওঘর গ্রামের গৃহবধূ আয়েশা খাতুন বলেন, কয়দিনের বৃষ্টিতে সব শেষ হওয়ার উপক্রম হইছিল। আজ রোদ পাইয়া খলায় আইছি। এই ধান বাঁচাইতে না পারলে সংসার চালানো কষ্ট হইয়া যাইবো।

‎অষ্টগ্ৰামের কলমা গ্ৰামের জেলে পাড়ার কৃষাণী রিতা রানী দাস বলেন, ‘সকাল থেইক্কা ধান উলডাইতেছি। রোইদ কতখান থাকবো কেডা জানে, ধান না হুগাইলে খাইমু কী? তাই যতখান পারি হুগাইতেছি।’

তবে রোদের দেখা মিললেও কৃষকদের দুশ্চিন্তা কাটেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় নদ-নদীর পানি কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অষ্টগ্রামের অনেক নিচু জমিতে এখনো পানি জমে রয়েছে। কোথাও কোথাও পানির মধ্যেই ধান কাটতে হচ্ছে কৃষকদের।

কৃষকরা জানান, মিঠামইনের ভরাজি বিল ও শিংরাকান্দা বিলে পানির মধ্যে ধান কাটতে গিয়ে অনেকেই জোঁকের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। ভয়ে অনেক শ্রমিক পানিতে নামতে সাহস পাচ্ছেন না। জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার মেশিন দিয়েও ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিকল্প উপায়ে ধান কাটার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা।

‎স্থানীয় কৃষক ইব্রাহিম মিয়া জানান, আর দুই-তিন দিন রোদ থাকলে অনেক ধান রক্ষা করা সম্ভব। আবার বৃষ্টি আইলে বড় ক্ষতি হইবো।

এদিকে শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি বেড়েছে ধান কাটার মজুরিও। পানিতে নেমে কাজ করতে গিয়ে শ্রমিকদের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ। নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৬৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অষ্টগ্রাম ও ইটনা উপজেলা।

রোদে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও হাওরজুড়ে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে খলায় নারীদের এই নীরব যুদ্ধই এখন কৃষকদের শেষ আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন

×