ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শেরপুর

চালক না থাকায় ৫ হাসপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ

চালক না থাকায় ৫ হাসপাতালে  সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ
×

শেরপুর সদর হাসপাতাল গ্যারেজে বন্দি বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্স সমকাল

দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ১৪ মে ২০২৬ | ০৯:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

শেরপুরের পাঁচটি হাসপাতালে চালক না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ রয়েছে। এই সুযোগে দ্বিগুণ ভাড়া নিয়ে রোগী বহন করছেন ব্যক্তি মালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্সের চালকরা। মুমূর্ষু রোগী নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়ছেন স্বজনরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেরপুর ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালে ৬ মাস ধরে অ্যাম্বুলেন্স চালক নেই। এ ছাড়া ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে আট মাসের অধিক, নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চার মাসের অধিক, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দুই মাসের বেশি সময় ধরে অ্যাম্বুলেন্স চালক নেই।
সরকারি হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে রয়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। ব্যক্তিমালিকানা অ্যাম্বুলেন্স চালকদের কাছে অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন তারা। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া আদায় করছেন ব্যক্তিমালিকানা অ্যাম্বুলেন্সের চালকরা। ফলে রোগীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা তাদের।

জানা গেছে, শেরপুর ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক প্রায় ৬ মাস আগে অবসরে যান। নতুন চালক নিয়োগ না হওয়ায় গ্যারেজে পড়ে আছে অ্যাম্বুলেন্সটি। এই হাসপাতালে ২০২১ সালে করোনা মহামারির সময় অত্যাধুনিক জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত সাড়ে ৪ কোটি টাকা মূল্যের বিশেষায়িত একটি অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেয় ভারত সরকার। কিন্তু দক্ষ জনবল (নার্স, চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান ও চালক) না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করতে পারছেন না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাঁচ বছর ধরে অনেক চিঠি চালাচালির পরও কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না।

এই পরিস্থিতিতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দরিদ্র রোগী ও তাদের স্বজনরা। ব্যক্তি মালিকানা অ্যাম্বুলেন্সে রোগী বহন করে ময়মনসিংহ ও ঢাকায় নিতে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া গুণতে হচ্ছে তাদের। জানা গেছে, সরকারি মূল্য তালিকা অনুয়ায়ী প্রতি এক কিলোমিটারে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ১০ টাকা। সেই হিসেবে শেরপুর থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত ১৪০ কিলোমিটার যাতায়াতে ভাড়া নেওয়া হয় এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্সগুলো রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছে তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা।

গত মঙ্গলবার সকালে জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসেন সজবরখিলা মহল্লার ৯০ বছর বয়সী এক মুমূর্ষু রোগী। তাঁকে ময়মনসিংহে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। তাঁর সঙ্গে আসা সোহাগ ও জয় নামে দুই তরুণ জানান, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে সাড়ে তিন হাজার টাকায় একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেন তারা। ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অ্যাম্বুলেন্স মানেই জীবন বাঁচানোর বাহন। সরকারি বাহন থাকার পরও যদি দরিদ্র মানুষকে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে যেতে হয় তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?

জেলা সদর হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে ‘আজকের তারুণ্য’ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির সভাপতি রবিউল ইসলাম রতনের ভাষ্য, তাদের সংগঠন ও সমাজসেবা দপ্তর থেকে প্রায়ই রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ ও ঢাকায় পাঠাতে হয়। ব্যক্তি মালিকানা অ্যাম্বুলেন্সে দ্বিগুণ, কখনও কখনও তিনগুণ ভাড়া দিয়েও রোগী পাঠাতে হয়।

জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তাহেরাতুল আশরাফী জানান, চালক অবসরে যাওয়ার পর নিয়োগ হয়নি। এ ছাড়া বিশেষায়িত অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করতে মেরামতের জন্য ঢাকায় পাঠাতে হবে এবং দক্ষ জনবল দরকার, সেসব নেই। তাই ইচ্ছে থাকার পরও অ্যাম্বুলেন্সটি সচল করা যাচ্ছে না। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।

শেরপুর সিভিল সার্জন অফিসের পাশেই ১০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র। এখানে নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রসবপূর্ব ও পরবর্তী সেবা দেওয়া হয়। এখানে অ্যাম্বুলেন্স মা ও শিশুর জীবন বাঁচানোর জরুরি বাহন। অথচ চালক সচিবালয়ে বদলি হওয়ার পর আট মাস ধরে অ্যাম্বুলেন্সটি গ্যারেজে পড়ে আছে। এই হাসপাতালের এমও ক্লিনিক ডা. মিজানুর রহমানের ভাষ্য, প্রায় প্রতিদিন এখানে প্রসব হয়। যে কোনো সময় মা অথবা শিশু স্বাস্থ্যের অবনতি হলে অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন। অ্যাম্বুলেন্স না পেলে রোগীর যে কোনো সময় অঘটন ঘটতে পারে। তাই সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়।

ঝিনাইগাতী, শ্রীবরদী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। এখানকার তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সাধারণ মানুষের উন্নত সরকারি সেবার নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। কিন্তু  অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাচ্ছেন না মানুষ। গত সোমবার দুপুরে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটকে দুই ব্যক্তি বেশ চিৎকার-চেচামেচি করছেন। সে সময় ঝিনাইগাতী সদরের সারি কালিনগর গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাশেম মিয়া জানান, তাঁর দাদি অসুস্থ। অ্যাম্বুলেন্সে শেরপুর সদরে নিতে হবে। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চালক না থাকায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ। তিনি বলেন, ‘ঝিনাইগাতী থেকে শেরপুর জেলা সদর হাসাপাতালে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া ৪০০ টাকা। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন অ্যাম্বুলেন্সে ভাড়া চাচ্ছে ২ হাজার ৫০০ টাকা। আমরা গরিব মানুষ। এত টাকা ব্যয় করে কীভাবে চিকিৎসা করাব।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সাদ্দাম হোসেন জানান, চালক অবসরে যাওয়ার পর শূন্যপদে লোক দিতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু নিয়োগ না হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘মানুষের কটু কথা শুনতে হচ্ছে। মেনে নিচ্ছি।’

কথা হয় নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জুনায়েদ আব্দুল কাইয়ুমের সঙ্গে। তিনি সদ্য এসেছেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাড়ি চালক নিখিল অবসরে যাওয়ার পর নিয়োগ হয়নি বলে জানান তিনি। হতাশা প্রকাশ করে এই কর্মকর্তা জানান, একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হয়েছে। সেখানে চালকের পদ নেই। কবে অ্যাম্বুলেন্স চালক পাবেন তাঁর ঠিক নেই।

শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম মফিদুল ইসলাম বলেন, অবসরে চলে যাওয়ার পর অ্যাম্বুলেন্স চালককে অনুরোধ করেছেন তিনি যেন গাড়িটি চালান। তিনি যদি সরকারি মূল্যের বাইরে নিজের পারিশ্রমিক নেন তাহলেও দরিদ্র রোগীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। কারণ শ্রীবরদীতে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো অ্যাম্বুলেন্স নেই। শেরপুরে থেকে এলে ২ হাজার ৫০০ টাকা লাগে। সরকারি ভাড়া মাত্র ৪০০ টাকা। চালক এক হাজার টাকা নিলেও দেড় হাজারের মধ্যে রোগী নিয়ে যাওয়া যাবে। এ বিষয়ে সিভিল সার্জনের অনুমতি চেয়েছেন বলে জানান তিনি।

অ্যাম্বুলেন্স সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে শেরপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন বলেন, চালক সংকট। জেলা সদর হাসপাতাল এবং সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে আলাদাভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চালক এবং অন্যান্য জনবল নিয়োগ দিতে হবে। সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে নিয়োগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।

আরও পড়ুন

×