ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নিজেদের বীজে নিজের ফসল

নিজেদের বীজে নিজের ফসল
×

ঈশ্বরদীর হাজারীপাড়ায় ফসলের বীজ নিয়ে কৃষকদের আলোচনা। সম্প্রতি তোলা - সমকাল

 সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী (পাবনা)

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৯:০২ | আপডেট: ২২ মে ২০২৬ | ১১:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিভিন্ন কোম্পানির ফসলের বীজ কিনে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন কৃষক। এতে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কৃষি। বীজ কিনতে গিয়ে কৃষকদের প্রতি মৌসুমে অনিশ্চয়তায় ভুগতে হচ্ছে। তবে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের হাজারীপাড়া গ্রামের কৃষকদের এ ধরনের কোনো চিন্তা নেই। কারণ তিন দশকের বেশি সময় ধরে তারা নিজেরাই ফসলের বীজ সংরক্ষণ করে আবাদ করছেন।

হাজারীপাড়ার কৃষকরা জানান, গ্রামের পাঁচ শতাধিক কৃষকের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ‘বীজ সম্পদ কেন্দ্র’। এর মধ্যে ২৭০ জন নিয়মিত নিজের ফসলের বীজ জমা করেন এখানে। এই ভান্ডারে রয়েছে বিভিন্ন ফল-ফসলের ৮৪৫ জাতের বীজ। সেখানে জমা করা বীজ নিয়ে প্রতি মৌসুমে ফসল ফলাচ্ছেন কৃষকেরা।

ঘরভর্তি বীজ
সরেজমিন দেখা যায়, দোচালা টিনের একটি বড় ঘরে বৈয়াম, প্যাকেটে থরে থরে সাজানো বীজ। বীজভর্তি কিছু বৈয়াম দড়িতে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এগুলোর সংরক্ষণের কাজে বেশি সময় দেন নারীরা। তারা জানান, এখানে ৩২ জাতের আউশ, ৪৮১ জাতের আমন ও ১৬ জাতের বোরো ধানের বীজ রয়েছে। শুধু ধানের বীজই রয়েছে ৫২৯ জাতের। রয়েছে ৩৪ প্রজাতির ফলের বীজ, ৩৩ জাতের ফুলের বীজ, ২০ জাতের ঔষধি গাছের বীজ, তিন জাতের মসলার বীজ, ৩৪ জাতের কাঠ জাতীয় গাছের বীজ, চার জাতের বাঁশ ও চার প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় গাছ এবং শীত ও গ্রীষ্মকালীন সবজির ১৫৫ জাতের বীজ।

কৃষকরা জানান, সাধারণত দেশে দু-এক জাতের শিম, বেগুন, টমেটো বাজারে পাওয়া যায়। তবে হাজারীপাড়ার এই সংগ্রহশালায় রয়েছে ৫৩ জাতের শিম, ২২ জাতের বেগুন, ১১ জাতের মিষ্টি কুমড়া, সাত জাতের লাউ, চার জাতের চাল কুমড়া, চার জাতের করলা, তিন জাতের শসা, তিন জাতের চিচিঙ্গা, ১৩ জাতের টমেটো, চার জাতের ঝিঙা, পাঁচ জাতের ধুন্দল, চার জাতের মুলা, ছয় জাতের ঢ্যাঁড়শ, পাঁচ জাতের বরবটি, ১০ জাতের ডাঁটা, চার জাতের পেঁপে, এক জাতের গাজর, দুই জাতের সজিনা, এক জাতের বঙ্গিমা শিম, চার জাতের বাঙ্গি, কলা, লালশাক, পুঁইশাক, পালংশাক, বতুয়াশাক ও পাটশাকের বীজ। আরও রয়েছে মাষকলাই, অড়হড়, খেসারি, মটর, মসুর, ফেলন, তৈলবীজ সরিষা, তিল, রাই, তিসির বীজ।

কৃষকদের এই উদ্যোগে পাশে রয়েছে নয়াকৃষি আন্দোলন ও উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)। কৃষকেরা নিজের জমিতে উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ হিসেবে একটি অংশ এই কেন্দ্রে সংরক্ষণ করেন। আবাদের সময় এলে যার যে ফসলের বীজ প্রয়োজন, তা নিয়ে জমিতে রোপণ করেন। তারা কীটনাশক কিংবা রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে জমিতে শুধু জৈব সার প্রয়োগ করে বিষমুক্ত সবজি, ফল ও ফসল উৎপাদন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

বীজ সংগ্রহ করতে পারেন যে কেউ
কৃষক আব্দুল খালেক বলেন, “বারবার বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে বীজ কিনে প্রতারিত হয়ে প্যাকেটজাত বীজ থেকে আমাদের গ্রামের কৃষকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এখন কৃষকদের উৎপাদন করা ফসলের স্থানীয় জাতের বীজের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আমরা উৎপাদিত বীজের একটি অংশ নয়াকৃষি ‘বীজ সম্পদ কেন্দ্রে’ জমা রাখি। এই বীজ সংগ্রহশালাকে ‘বীজ আখড়া’ও বলা হয়ে থাকে। কৃষকেরা তাদের প্রয়োজনে এখান থেকে বীজ সংগ্রহ করতে পারেন।”

আরেক কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমাদের সংগ্রহে স্থানীয় জাতের ধান হিদি, ধলদীঘা, আজলদীঘা, বাঁশিরাজ, বাঁশমতি, কালিজিরা, ভরিলটা, মাটিভাংগর, জিরাশাইল, বেগুনবিচি ধানের বীজ আছে। এসব বীজ অন্য গ্রাম, অর্থাৎ যে কোনো গ্রামের যে কোনো কৃষক এসে সংগ্রহ করতে পারেন। কেউ কেউ বীজ ধার করে নিয়ে যান। ফসল ওঠার পর আবার তা ফেরত দেন।’

তা ছাড়া এক কৃষক আরেক কৃষকের কাছ থেকে বীজ কেনেন। কৃষক আকলিমা বেগম বলেন, ‘আমার প্রতিবেশী কৃষকরা তাদের প্রয়োজনীয় অধিকাংশ বীজ আমার কাছ থেকে কিনে নিয়ে যান।’

যেভাবে সফল এই উদ্যোগ
বীজ সংরক্ষণের এমন উদ্যোগ এখনও দেশের কিছু গ্রামে দেখা যায়। তবে সেটা সমষ্টিগত নয়, ব্যক্তিগত। প্রত্যেক গ্রামে এমন কয়েক কৃষক আছেন, যারা নিজের জমিতে উৎপাদিত ধান বা অন্য ফসলের বীজ অল্প করে হলেও সংরক্ষণ করেন। পরের মৌসুমে এগুলো রোপণ করেন। বীজ সংরক্ষণের এই উদ্যোগ প্রাচীন। কিন্তু বিভিন্ন কোম্পানির ফাঁদে পড়ে তা বিলুপ্তির পথে। 

হাজীপাড়ার কৃষকেরা বীজ সংরক্ষণের প্রাচীন উদ্যোগ কীভাবে এবং কবে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলেন, তা জানতে চাইলে কয়েক কৃষক বলেন, ১৯৮৮ সালের বন্যায় সারাদেশের মতো তাদের গ্রামের সব ফসলও তলিয়ে যায়। এতে ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরের মৌসুমে আবাদের জন্য কোনো বীজ ছিল না। সে সময় বিভিন্ন সামাজিক ও কৃষিবিষয়ক সংগঠনের লোকজন হাজারীপাড়ার কৃষকদের কাছে যান। তারা জানতে চান, ফসল আবাদের জন্য কৃষকেরা কী ধরনের সহায়তা প্রত্যাশা করেন। তখন সব কৃষক বলেছিলেন, তারা বীজ চান। 

এরপর নয়াকৃষি আন্দোলনের মতো সংগঠন এগিয়ে আসে। তারা কৃষকদের বীজ দিয়ে সহায়তা করেন এবং পরে বীজ কেন ও কীভাবে সংরক্ষণ করবেন, সে বিষয়ে নানান পরামর্শ দেন। এক পর্যায়ে বীজ সম্পদ কেন্দ্রের জন্য জমি কিনে দেয় নয়া কৃষি আন্দোলন। সেই জমিতেই গড়ে তোলা হয়েছে এক কক্ষের বিশাল সংগ্রহশালা। সেখানে নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কৃষকেরা একে অপরের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন।

‘অনন্য দৃষ্টান্ত’ বলছেন সংশ্লিষ্টরা
মুলাডুলি ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক সেহাব উদ্দিন বলেন, হাজারীপাড়ার শত শত কৃষক বীজ সংরক্ষণ করেন। এটি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
উবিনীগ ও নয়াকৃষি আন্দোলনের ঈশ্বরদী আঞ্চলিক কার্যালয়ের সমন্বয়ক আজমিরা খাতুন জানান, তারা গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে তাদের উৎপাদিত ফসল থেকে বীজ সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘদিন থেকে উদ্বুদ্ধ করছেন। এতে খুব ভালো সাফল্য মিলেছে।

কৃষি গবেষক গোলাম মোস্তফা রনি বলেন, অন্য এলাকার কৃষকরাও এভাবে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিলে বীজ নিয়ে সংকট ও ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারেন।
বীজ সম্পদ কেন্দ্রে সংগৃহীত বীজ বিভিন্ন দুর্যোগে আপৎকালীন বীজ সহায়ক হিসেবেও কার্যকরী ভূমিকা রাখছে বলে জানান উবিনীগের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম জনি। 
ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মোমিন বলেন, ‘সামাজিক বীজ সম্পদ কেন্দ্র’ একটি চমৎকার বীজ ব্যবস্থাপনা। এ ব্যবস্থা আগে ছিল। এখন হারিয়ে গেছে। সব গ্রামে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের কৃষি খাতের উন্নয়ন হবে।

 

আরও পড়ুন

×