ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মামলা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মামলা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের
×

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে প্রায় তিন শতাধিক ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ কাটার প্রতিবাদ করেছিলেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। গত এপ্রিলের এই ঘটনার পর তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ এনে গত রোববার রাতে শ্যামনগর থানায় মামলা করেছেন এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আইন কর্মকর্তা। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। 
নজরুল ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা কমিটির সদস্য। তাঁর সঙ্গে আসামি করা হয়েছে ছেলে আব্দুর রহমানকেও। এ ছাড়া বিশ্বজিৎ মণ্ডল ও মো. সবুজের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় ২০-২৫ জনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। 

বুড়িগোয়ালিনীর বাসিন্দা আব্দুল আজিজ ও আইয়ুব আলীসহ কয়েকজন জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশন বুড়িগোয়ালিনী ও গাবুরায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কারের কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি খোলপেটুয়া নদীর অপর একটি অংশের চর দখলে নিয়ে ব্লক নির্মাণের ইয়ার্ড স্থাপন করে। নতুন ইয়ার্ড স্থাপনে তারা রাতারাতি খোলপেটুয়া নদীর দুর্গাবাটি এলাকার চর দখল করে। 

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, ১৩ এপ্রিল রাতে সুন্দরবনসংলগ্ন খোলপেটুয়া নদীর দুর্গাবাটি চরের তিন শতাধিক ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছ কেটে ফেলে দুর্বৃত্তরা। একই রাতে তিনটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে চরের প্রায় ১৫ একর জায়গায় বেড়িবাঁধের মতো রি-বাঁধ গড়ে তোলা হয়। এতে ওই অংশে নদীর জোয়ারভাটার পানি ওঠানামা বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে পরদিন সকালে স্থানীয় গ্রামবাসীকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। তিনি বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে জানালে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন ঘটনাস্থলে যান। রাতেই তাঁর নির্দেশনায় নির্মিত বাঁধ সরিয়ে জোয়ার-ভাটার পানি চলাচলের রাস্তা করা হয়। এরপর থেকে ওই অংশে বাঁধের সংস্কার কাজ বন্ধ করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এলাকার লোকজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আর-রাদ করোপেরেশন ২০২২ সাল থেকে শ্যামনগরের উপকূলীয় এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কারের কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানের মালিক সবুজ খান তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীর ভাগনে পরিচয়ে অবৈধভাবে খোলপেটুয়া নদীর চর দখল করে। এ ছাড়া কলবাড়ি সেতুসংলগ্ন এলাকার প্রায় ৯০ একর জমি নামমাত্র দামে ইজারা নিয়ে চিংড়ি প্রকল্প গড়ে তোলা হয়। সবুজ খান এখন বর্তমান সরকারের আরেকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম গাছ কাটার প্রতিবাদ করায় তাঁর নামে মামলা দেওয়া হয়েছে হয়রানির উদ্দেশ্যে। 

মামলার বাদী আর-রাদ করোপেরেশনের আইন কর্মকর্তা জালাল উদ্দিনের ভাষ্য, নজরুল ইসলাম ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদা দাবি করছেন। বাধ্য হয়ে গত ১৩ মে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, জাইকার অর্থায়নে বাঁধ সংস্কারের কাজের জন্য সরকার চরটি আর-রাদ করপোরেশনকে ইজারা দিয়েছে। তবে ইজারা নিলেও তারা গাছ কাটতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নে জালাল উদ্দিন দাবি করেন, গাছগুলো একেবারেই ছোট। আর এগুলো কেউ লাগাননি। তাঁর অভিযোগ, চার-পাঁচদিন আগে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ইয়ার্ডে এসে চাঁদা দাবিসহ নানাভাবে হুমকি দিয়েছেন। সবকিছুর রেকর্ড তাদের কাছে আছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে সংযোগ পাওয়া যায়নি। তাঁর ছেলে আব্দুর রহমানের ভাষ্য, আর-রাদ করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দুই দফায় দুই জায়গার চর দখল করে গাছ কেটে ইয়ার্ড তৈরি করেছে। তারা আবারও দুর্গাবাটির ভাঙনকবলিত অংশের চর দখলে নিয়ে গাছ কেটে ফেলে। গ্রামবাসীদের অভিযোগের পর তাঁর বাবা আপত্তি জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে হয়রানি করার জন্য প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে তাদের আটকানোর পরিকল্পনার অভিযোগ তুলেন আব্দুর রহমান।
শ্যামনগর থানার ওসি খালেদুর রহমান বলেন, চাঁদা দাবিসহ হামলা-ভাঙচুরের কয়েকটি ধারায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে। তদন্তেই সবকিছু বেরিয়ে আসবে।
শ্যামনগরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন বলেন, চরের গাছ কাটার খবর পেয়ে মাস দেড়েক আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এখন জায়গাটি সেভাবেই আছে। দুই-তিনদিন আগে দুই পক্ষ ভিন্ন ঘটনায় বিবাদে জড়িয়ে পড়ায় হয়তো মামলা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, কৃত্রিম বা প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছ কাটার আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। 

আরও পড়ুন

×