ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন

বিপর্যয়ের শঙ্কা সত্ত্বেও বাড়ছে গভীর নলকূপ

বিপর্যয়ের শঙ্কা সত্ত্বেও বাড়ছে গভীর নলকূপ
×

শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ 

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ | ১০:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে পারছে না নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। এ কারণে নাগরিকরা বাসাবাড়িতে গভীর নলকূপ স্থাপন করছেন। দিন দিন এ প্রবণতা বাড়ছে, একই সঙ্গে তাদের চাপের মুখে বিষয়টি আরও সহজ করে দিচ্ছে সিটি করপোরেশন। এখন নগরবাসীর একটি অংশ গভীর নলকূপের জন্য রেজিস্ট্রেশন ফি ও নবায়ন ফি কিছুই দিতে চাচ্ছেন না। সিটি কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের এ দাবি মানা হলে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে গিয়ে পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। 

জানা গেছে, ২০২৪ সালে সিটি করপোরেশন এলাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক মিলিয়ে গভীর নলকূপ ছিল ৬৬৮টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯১৮টিতে। অর্থাৎ, এক বছরেই ২৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে নগরীতে। আর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ৫ মাসে এ সংখ্যা ৯৪৮টিতে পৌঁছেছে। 

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ বিভাগের রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ হান্নান মিয়া বলেন, ধারাবাহিকভাবে সিটি করপোরেশন এলাকায় গভীর নলকূপ বসানোর প্রবণতা বাড়ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে ২০০টির বেশি গভীর নলকূপ স্থাপনের আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তাঁর মতে, সিটি করপোরেশনের অনুমোদনের বাইরে কয়েকগুণ অনুমোদনহীন ডিপ টিউবওয়েল রয়েছে। এভাবে গভীর নলকূপের সংখ্যা বাড়তে থাকলে তা সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয় তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের কর্মকর্তা (উপপরিচারক) এইচ এম রাশেদ বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২০২২ সালের গবেষণার বরাত দিয়ে জানান, রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিবছর গড়ে এক থেকে দেড় মিটার পর্যন্ত নেমে যাচ্ছে। কারণ এসব এলাকার ভূগর্ভে পানি পুনর্ভরণ খুব কম হচ্ছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালে যে স্থানে ২৩০ ফুট গিয়ে পানি পাওয়া যেতো পরের বছর সেখানে ২৪০ ফুটে গিয়ে পানি পেতে হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের কেন্দ্রে সুপেয় পানি পেতে আরও অনেক বেশি গভীরে যেতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ক্রমাগত সহজ হচ্ছে প্রক্রিয়া
উদ্বেগজনক এ চিত্রের মধ্যেই গভীর নলকূপ স্থাপন ও ব্যবহার আরও সহজ করার দাবি জানাচ্ছে নাগরিকদের একটি অংশ। এ নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন তারা। গভীর নলকূপের রেজিস্ট্রেশন ফিসহ কোনো ধরনের ফি না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তাদের একটি সংগঠন। পরিবেশ বিপর্যয়ের ইস্যুতে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্র এবং নারায়ণগঞ্জ শাখার পরস্পরবিরোধী অবস্থানও দেখা যাচ্ছে।
নগরীর ১৩নং ওয়ার্ডের আল্লামা ইকবাল রোডের বাসিন্দা কাজী ইসলাম মিয়া। তিনি গলাচিপা জামে মসজিদের সভাপতিও। এ রোডে তাঁর ছয় তলা ভবন। দীর্ঘদিন তিনি ওয়াসা ও পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পানির ওপর নির্ভর করে ভবন চালালেও সম্প্রতি আর পারেননি। কয়েক মাস আগে বসিয়েছেন গভীর নলকূপ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ওয়াসার পানিটা এমনিতে হয়তো গোসল, কাপড় ধোয়া বা টয়লেটে ব্যবহার করা যায় কিন্তু পান করা বা রান্নার কাজে ব্যবহার করা যায় না। বিশুদ্ধতার জন্য বাধ্য হয়ে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি উত্তোলন করছি।  

তাঁর মতোই একই ধরনের পরিস্থিতি ১১নং ওয়ার্ডের হাজিগঞ্জের শীতলক্ষ্যা হাউজিং এলাকার বাসিন্দা এ এইচ তালুকদারেরও। তিনি জানান, পাইপে এত ময়লা পানি আসে যে এটা ব্যবহার করা যায় না। বাধ্য হয়ে অধিকাংশ বাড়িওয়ালার মতো আমিও ডিপ টিউবওয়েল বাসিয়েছি।  

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রায় সব মহল্লাতেই একই পরিস্থিতি। মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো অনেক মহল্লায় আবার পানিই থাকে না।  
এক সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় পানি সরবরাহের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার থাকলেও বর্তমানে তা করপোরেশনের হাতে। ১৮৭৬ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা গঠনের সময় নাগরিকদের জন্য পৌরসভার পানি সরবরাহের নিজস্ব ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পরে ওয়াসা গঠন করা হলে ১৯৯০ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার পানি সরবরাহের দায়িত্ব ওয়াসার কাছে দেওয়া হয়। কিন্তু নগরীতে পানি সরবরাহে ওয়াসার বিরুদ্ধে নগরবাসীর অভিযোগের পাহাড় জমে উঠলে ২০১৯ সালে ওয়াসা থেকে পানি সরবরাহের দায়িত্ব নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। 

ওয়াসা দায়িত্ব নেওয়ার পরে শুরুতে গভীর নলকূপ বসানোর অনুমোদন ফি এক লাখ ৬০ হাজার টাকা, ৬০ হাজার টাকা বার্ষিক নবায়ন ফি ও পানি ব্যবহারের ওপরে চার্জ নির্ধারণ করে। এর বিরুদ্ধে ‘ওয়াসা হটাও সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জে। এ আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়কার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ঘোষণা দেন নারায়ণগঞ্জে গভীর নলকূপের পানির কোনো ফি দিতে হবে না। তবে ২০০৮ সালে ঢাকায় বাপার বিভিন্ন কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে ওয়াসা আবারও গভীর নলকূপের বিষয়ে কঠোর হয়। ওই বছর অনুমোদন ফি ৮০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর আবারও আন্দোলন হলে এটি কমিয়ে ৪০ হাজার টাকা ও নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা করা হয়। পরে সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হলে তিনি অনুমোদন ফি ২০ হাজার টাকা ও নবায়ন ফি ৫০০ টাকা করেন। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শাখাওয়াৎ হোসেন খান সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নির্বাচিত হওয়ার পরে অনুমোদন ফি পাঁচ হাজার টাকা ও নবায়ন ফি ১০০ টাকা নির্ধারণ করেন। ব্যবহৃত পানির বিল সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয়। ডিপ টিউবওয়েল বসানোর প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি সিটি করপোরেশন এটি রোধে রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে তৎপর হয়।  

তবে এই পাঁচ হাজার টাকা অনুমোদন ফি-ও না দেওয়ার জন্য ‘গভীর নলকূপ ব্যবহারকারী আবাসিক সমবায় সমিতি’ আন্দোলন করছে। এই সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইলের দাবি, সিটি করপোরেশন ৭ ভাগ নগরবাসীকে পানি দিতে পারছে। আর ১ ভাগ মাত্র নগরবাসীকে সুপেয় পানি দিতে পারছে। বাকিরা পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সিটি করপোরেশন যেখানে পানি দিতে পারছে না সেখানে তারা অনুমোদন ফি চায় কিভাবে? 

তবে তাঁর এ তথ্য সত্য নয় বলে দাবি করেছেন সিটি করপোরেশনের সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল জুবায়ের। তিনি বলেন, সিটি এলাকায় ১৮ কোটি লিটার পানির চাহিদা থাকলেও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা রয়েছে ১১ কোটি লিটার সরবরাহের। তবে এডিবির অর্থায়নে সিটি করপোরেশন ‘নারায়ণগঞ্জ গ্রিন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ নামের একটি প্রকল্প শুরু করেছে। এই প্রকল্প শেষ হলে সিটি করপোরেশন বর্তমান ১১ কোটি লিটারের জায়গায় ১৬ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে পারবে। তিনি বলেন, রেজিস্ট্রেশন ফি এমনিতেই বেশ কম। একেবারে না থাকলে মানুষ তখন দেদার গভীর নলকূপের পানি তুলতে থাকবে। তখন পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দেবে। তিনি বলেন, সুপেয় পানি দিতে সিটি করপোরেশন গভীর নলকূপ বসায়। কিন্তু পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে সিটি করপোরেশন গভীর নলকূপ থেকে সরে আসছে। এখন মেঘনা নদী থেকে পানি শোধন করে নারায়ণগঞ্জ সিটিতে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। 

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয় তাহলে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় হতে পারে। মাটির নিচে পানি না থাকলে ভূমিধস হতে পারে। ভূমিকম্পের সময় ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের ভূগর্ভস্থ পানি এমনিতেই বেশ নেমে গেছে। তাই সিটি করপোরেশন যে কাজটি করছে সেটি সঠিক। গভীর নলকূপ বসানো নিরুৎসাহিত করতে হবে। তবে পাশাপাশি মানুষকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহও করতে হবে। এ জন্য ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়াতে হবে। 
তবে বাপার নারায়ণগঞ্জ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম সম্প্রতি ‘গভীর নলকূপ ব্যবহারকারী আবাসিক সমবায় সমিতির সভায় গভীর নলকূপের ফি দেবেন না বলে ঘোষণা দেন। এ প্রসঙ্গে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, এটি নারায়ণগঞ্জবাসীর দাবি। আমি মানুষের দাবিটি তুলে ধরেছি।

‎এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, রেজিস্ট্রেশন ফি যতটুকু কমানো হয়েছে এর চেয়ে কমানো সম্ভব নয়। এটি ৫০০০ টাকাই থাকবে। তবে একটি সংগঠনের আন্দোলনের পরে মাসিক ফি আমরা সম্পূর্ণ মওকুফ করেছি। এর চেয়ে বেশি আর কি করব? কারণ পরিবেশগত দিকটাও আমাদের দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, কেউ কেউ পরিবেশগত দিকটা উপেক্ষা করে নলকূপ নিয়ে মানুষকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করছেন। হয়তো তাদের রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য আছে। 
প্রশাসক আরও বলেন, দুদিন আগে বা পরে পানির দায়িত্ব আবার ওয়াসার কাছে ফেরত 
যাবে। তখন কিন্তু রেজিস্ট্রেশন ফি অনেক বেড়ে যাবে। এখন কম রেজিস্ট্রেশন ফির সুযোগে নগরবাসীর উচিৎ নিজ নিজ গভীর নলকূপ রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নেওয়া।

আরও পড়ুন

×