ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র-গুলির কারবারে জনপ্রতিনিধি

অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র-গুলির কারবারে জনপ্রতিনিধি
×

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:৩১

হাবিবুর রহমান বিশ্বাস একজন জনপ্রতিনিধি। তিন বছর আগে স্থানীয় নির্বাচনে ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার নির্বাচিত হন বিপুল ভোটে। যশোরের শার্শা উপজেলার পুটখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার তিনি। প্রভাব-প্রতিপত্তির সঙ্গে জনপ্রিয়তাও কম নয় তার। কিন্তু এসবের আড়ালে তিনি বেনাপোল সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রের কারবারে যুক্ত। সীমান্তঘেঁষা গ্রামের এই জনপ্রতিনিধি অস্ত্র চোরাচালানের বড় সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। বেনাপোলের পুটখালী আর ভারতের চব্বিশ পরগনার আংরাইল গ্রাম- দু'পাড়েই সক্রিয় তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা। সম্প্রতি ঢাকায় হাফিজুর রহমান নামে অস্ত্র চোরাচালানকারী দলের একজন সদস্য গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দা পুলিশ এসব তথ্য জানতে পারে।


ঢাকার ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, গত সোমবার ঢাকার মিরপুর থেকে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলিসহ হাফিজুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হাবিবুর রহমান বিশ্বাস ওরফে হাবিব মেম্বারের বিষয়ে তথ্য দেয় সে। তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দু'দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

হাফিজুরকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বেনাপোল সীমান্তের অস্ত্র চোরাকারবারিরা। এই হাফিজুর হচ্ছে হাবিবুর রহমান বিশ্বাস ওরফে হাবিব মেম্বারের সিন্ডিকেটের সদস্য। সে ঢাকায় একটি গ্রুপের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দিতে এসে ধরা পড়ে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তর বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান বলেন, 'হাফিজুর সীমান্তে অস্ত্র কারবারের বিষয়ে বেশকিছু তথ্য দিয়েছে। সে জানিয়েছে, অস্ত্র চোরাচালানোর মূল হোতা হাবিব মেম্বার। তার নির্দেশেই ঢাকায় সে চারটি অস্ত্র নিয়ে এসেছিল। এই চক্রের অবৈধ অস্ত্র বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোকে সরবরাহ করা হয়েছে।'

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, বেনাপোলে সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিজিবির কঠোর নজরদারিতে অস্ত্র চোরাচালানিরা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এর পরও হাবিব মেম্বারের সিন্ডিকেট কৌশলে অস্ত্র চোরাচালান করে আসছিল।

অবশ্য যশোরের পুটখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাদিউজ্জামান সমকালকে বলেন, 'সীমান্ত এলাকায় বাড়ি হওয়ায় হাবিব মেম্বার ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসা করতেন বলে তিনি জানতেন। তার বিরুদ্ধে অবৈধ হুন্ডির মামলা রয়েছে বলেও শুনেছেন। কিন্তু তার পরিষদের এই মেম্বার যে অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানে জড়িত, তা তিনি জানতে না।'

চেয়ারম্যান বলেন, হাবিব মেম্বার নিয়মিত পরিষদে আসেন না। তিনি কোথায় আছেন, তাও জানেন না।

অবৈধ অস্ত্রের রুট বিহার-আংরাইল-পুটখালী :গ্রেপ্তার হওয়া হাফিজুর জানিয়েছে, হাবিব মেম্বারের অন্যতম সহযোগী জিল্লুর রহমান। তাদের সঙ্গে বিহারের অবৈধ অস্ত্র তৈরির কারখানাগুলোর যোগাযোগ রয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিহারের ওই গ্রুপের কাছ থেকে অস্ত্র কেনা হয়। এর পর কলকাতার অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে তা নিয়ে আসা হয়। ওই এলাকার চোরাচালান সিন্ডিকেটের সদস্যরা অস্ত্র ও গুলি সীমান্ত এলাকায় লুকিয়ে রাখে। উত্তর চব্বিশ পরগনার আংরাইল গ্রাম ও বনগ্রাম এলাকায় এসব অস্ত্র রাখা হয়। এরপর ক্রেতা পেলে তা বেনাপোলের পুটখালী সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।

ডিবির উত্তর বিভাগের এডিসি মহরম আলী সমকালকে জানিয়েছেন, হাবিব মেম্বারের সিন্ডিকেট একটি অস্ত্র বিহারের সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় কেনে। কলকাতার সিন্ডিকেটের হাতবদল হতে প্রতি অস্ত্রে আরও ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। বাংলাদেশের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর কাছে পরে তা উচ্চ দামে বিক্রি হয় বলে হাফিজুর জানিয়েছে।

ডিবির এই কর্মকর্তা বলেন, ২০১৮ সালে ঢাকা থেকে ডাকাত গ্রুপের কয়েক সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর হাবিব মেম্বারের গ্রুপের সন্ধান পেয়েছিলেন তারা। এক বছর ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে বিহার-আংরাইল-পুটখালী রুটে অবৈধ এই অস্ত্র সিন্ডিকেটের এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

ওপারের নিয়ন্ত্রণ জাহাঙ্গীরের হাতে :ডিবি কর্মকর্তারা বলছেন, বিহার-আংরাইল-পুটখালী রুটে অস্ত্র চোরাকারবারি সিন্ডিকেটে কলকাতায় দায়িত্বে রয়েছে জাহাঙ্গীর নামে এক ব্যক্তি। তার বাড়ি উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগ্রামে। জাহাঙ্গীর মূলত বেনাপোলের হাবিব মেম্বারের হয়ে বিহারের গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। জিজ্ঞাসাবাদে হাফিজুরও জানিয়েছে, ভারত থেকে একটি অস্ত্র চোরাচালান করতে জাহাঙ্গীরকে ৩০ হাজার টাকা করে দিতে হয়। হাবিব মেম্বারের হয়ে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে জিল্লুর রহমান যোগাযোগ রক্ষা করে।

ডিবি-উত্তর বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমান জানিয়েছেন, হাফিজুরকে গ্রেপ্তারের পর উত্তর চব্বিশ পরগনার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর নামে যে নাম এসেছে, তা তারা ভারতের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাবেন।

যেভাবে ওপার থেকে এপারে আসে অস্ত্র :বেনাপোলের পুটখালী গ্রামের বাসিন্দা হাফিজুর জানিয়েছে, সে এক সময় হাবিব মেম্বারের কর্মচারী হিসেবে গরু চোরাচালান করত। কিন্তু সীমান্তে কড়াকড়িতে সেই বাণিজ্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর পরই ভিন্নপথে অস্ত্র চোরাচালান শুরু হয়। বেনাপোলের পুটখালী গ্রাম সীমান্তেই ইছামতী নদী। ওই নদীর ওপারেই চব্বিশ পরগনার আংরাইল গ্রাম। সিন্ডিকেটের ওপারের সদস্যরা আংরাইল গ্রামে অস্ত্র মজুদ করে রাখে। সেগুলো প্লাস্টিকের কাগজে বিশেষভাবে মোড়ানো হয়। সুযোগ বুঝে ওই নদীতে গোসলের ফাঁকে প্লাস্টিক প্যাঁচানো অস্ত্র নদীপথে সাঁতার কেটে পুটখালী অংশে পৌঁছে দেয় ওপারের সদস্যরা। এ ছাড়া পুটখালী গ্রামের ভেতর দিয়ে অন্য পথেও কৌশলে অস্ত্র চোরাচালান হয়।

ডিবি-উত্তর বিভাগের এডিসি মহরম আলী জানিয়েছেন, হাফিজুরের তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে। এ ছাড়া চারটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের মামলার অন্যতম আসামি হাবিব মেম্বার ও জিল্লুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা গেলে বিস্তারিত তথ্য মিলবে। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন

×