জঙ্গল সলিমপুর সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে, তবে আপাতত কাউকে উচ্ছেদ করা হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ছবি: সমকাল
চট্টগ্রাম ব্যুরো ও সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬ | ১৮:৪২ | আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ | ১৮:৫৩
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য যেখানেই থাকুক না কেন, তা নির্মূল করতে হবে। রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে যারা চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে, তাদের আস্তানা কোথায় আমরা দেখতে চাই। তাদের আস্তানা আমরা নির্মূল করব। আর জঙ্গল সলিমপুর অঞ্চলকে সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে। শুধু তাই নয়, পার্শ্ববর্তী বেতুয়া ও চা বাগান নামে দুটি পাহাড়ি জনপদকেও সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে। তবে জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে যারা বসবাস করছেন আপাতত তাদের উচ্ছেদ করা হবে না।’ কেউ উচ্ছেদ আতঙ্ক ছড়ালে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন মন্ত্রী।
আজ রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আয়োজিত মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সিটি মেয়র ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সম্প্রতি পুলিশ, বিজিবি, র্যাব, সামরিক বাহিনীসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে যৌথ অভিযান চালিয়েছে। প্রায় চার হাজার সদস্যের যৌথবাহিনী এখানে কাজ করেছে। রাষ্ট্রের সব বাহিনী জনগণের নিরাপত্তা ও জনস্বার্থে কাজ করবে। আমাদের প্রথম লক্ষ্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। সন্ত্রাসীরা যাদেরই আশ্রয়ে থাকুক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
জঙ্গল সলিমপুর, আলীনগর এবং আশপাশের এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সরকারি স্থাপনা নির্মাণ ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
সম্ভাব্য নতুন কারাগার স্থাপনের জায়গাও পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় জেলা প্রশাসন শিগগির বরাদ্দ করা সরকারি খাস জমি কারা কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেবেন জানান তিনি।
মতবিনিময় সভা ও জঙ্গল-সলিমপুর পরিদর্শনের সময় মন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন, পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।
সার্কিট হাউজে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন স্থানীয় সংসদ সদস্য- এরশাদ উল্লাহ, মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, সরওয়াম জামাল নিজাম, শাহজাহান চৌধুরী, সাঈদ আল নোমান, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মোহাম্মদ এনামুল হক, জসিম উদ্দিন আহমেদ, সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান প্রমুখ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিগত ১৭ বছরের দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি বলেন বা রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের বলেন তার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ভেতরে এক ধরনের দুর্বৃত্তের রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল। জঙ্গল সলিমপুর তার প্রত্যক্ষ নমুনা। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রামে কিছু সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা গেছে। কিছু ব্যবসায়ীর বাসভবনে অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গুলি এবং চাঁদা আদায়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সরকার বিষয়গুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে। অপরাধীদের দমন করতে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় গত ৯ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিছুদিন আগে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে র্যাবের নির্মাণাধীন ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে সন্ত্রাসীরা। তারা কীভাবে এ দুঃসাহস হলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর পেছনে থাকা ভূমিদস্যু ও মূল ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে।
জঙ্গল সলিমপুরে সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী জানান, সলিমপুর ইউনিয়নের সঙ্গে সীতাকুণ্ড, ভাটিয়ারী-হাটহাজারী লিংক রোড এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সংযোগ ঘটিয়ে একটি আধুনিক রোড নেটওয়ার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ড্রোন চিত্র ও সড়ক মানচিত্র পর্যালোচনা করে এই অঞ্চলে পুলিশ, বিজিবি, র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সেনানিবাসের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির কাজ চলছে।
এ সময় জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সর্বস্তরের জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন মন্ত্রী।
জুয়া, মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ে কঠোর বার্তা
১৮৬৭ সনের বিদ্যমান জুয়া আইন দিয়ে বর্তমানে অনলাইন নির্ভর ও আধুনিক পদ্ধতির জুয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, জুয়া আইন বর্তমান সময়ের জন্য দুর্বল হওয়ায় তা মোকাবিলা করা যাচ্ছে না। এ কারণে আগামী সংসদ অধিবেশনে নতুন আইন বা সংশোধনী আনার চেষ্টা করা হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনেও সংশোধনী আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, মাদক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হবে। বর্তমানে বহু মাদক মামলা বছরের পর বছর ধরে বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
কিশোর গ্যাং দমনে আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনের সুযোগ নিয়ে অনেক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পরবর্তীতে তারা ভয়ংকর সন্ত্রাসীতে পরিণত হচ্ছে। এ বিষয় আইন সংস্কার করা হবে।
