ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

স্লুইসগেট বন্ধ রেখেই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

পুনর্খননে কি পানি আসবে করতোয়ায়

দ্রুত পলি জমে পুনরায় নদী ভরাটের আশঙ্কা

পুনর্খননে কি পানি আসবে করতোয়ায়
×

করতোয়া নদীর মূল প্রবাহ বন্ধ হওয়ার অন্যতম কারণ এই স্লুইসগেট। সম্প্রতি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খুলসি গ্রাম থেকে তোলা -সমকাল

লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল 

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

একসময় উত্তরবঙ্গের জীবনরেখা করতোয়া নদী এখন দখল, দূষণ ও ভরাটের চাপে মৃতপ্রায়। নদীর উৎসমুখে স্লুইসগেটটি কয়েক দশক ধরে কার্যত বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। অথচ স্লুইসগেট খোলা বা সম্প্রসারণের বিষয়টি আমলে না নিয়েই করতোয়া পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের জন্য ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। 
পরিবেশবিদদের দাবি, এই প্রবাহ সংকটই করতোয়ার দখল, দূষণ ও ভরাটের অন্যতম কারণ। তবে সমস্যার মূল উৎসের সমাধান ছাড়াই নদী পুনরুদ্ধারে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তুতি চলছে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার করতোয়া নদীর উৎসমুখ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণমুখী প্রবাহের মুখে নির্মিত একটি স্লুইসগেট বহু বছর ধরে বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। গেটের উত্তর পাশে নদীতে এখনও প্রবল স্রোত থাকলেও দক্ষিণে বগুড়ামুখী অংশে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোথাও নদীর তলদেশ জেগে উঠেছে, কোথাও চর পড়েছে, আবার কোথাও নদীর জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয়দের দাবি, আশির দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নির্মিত বাঁধ ও স্লুইসগেটের পর থেকেই করতোয়ার ভাটির অংশে পানিপ্রবাহ কমতে শুরু করে। বর্তমানে প্রায় ১২৩ কিলোমিটার এলাকায় নদী পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না।

গোবিন্দগঞ্জের প্রবীণ বাসিন্দা ও পাইলট স্কুলের শিক্ষক আলিম উদ্দিন বলেন, ‘একসময় এই নদীতে বড় বড় পণ্যবাহী নৌকা চলত। এখন অনেক জায়গায় হেঁটেই পার হওয়া যায়।’
গেটসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা আকরাম হোসেন বলেন, ‘খুলনা থেকে নৌকায় নারকেলসহ বিভিন্ন পণ্য আসত। নদীকে ঘিরে জেলেদের জীবন-জীবিকাও ছিল। গেট নির্মাণের পর ধীরে ধীরে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে যায়।’

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন জনপদের বিকাশে করতোয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প প্রস্তাবনাতেও উল্লেখ করা হয়েছে, করতোয়া একসময় তিস্তা নদীর প্রধান শাখাগুলোর একটি ছিল। ১৭৮৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর তিস্তার গতিপথ পরিবর্তিত হওয়ায় নদীটির মূল উৎস বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
জেলা নদী রক্ষা কমিটির সদস্য জিয়াউর রহমান বলেন, ‘উৎস পরিবর্তনের পরও মৌসুমি বৃষ্টি ও আঞ্চলিক জলপ্রবাহের মাধ্যমে করতোয়া টিকে ছিল। কিন্তু পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, দখল, ভরাট ও দূষণ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করেছে।’

প্রবাহ কমতেই শুরু দখলের প্রতিযোগিতা
পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার পর নদীর জমি দখল শুরু হয় ব্যাপকভাবে। বগুড়া শহর, শিবগঞ্জ, মহাস্থান, শাজাহানপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর তীর ও তলদেশ দখল করে গড়ে উঠেছে দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা। অনেক স্থানে নদীর প্রস্থ উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। 
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালালেও করতোয়ার বড় অংশ এখনও বেদখল অবস্থায় রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দূষণ। বগুড়া শহরের অসংখ্য ড্রেন সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। বাজারের বর্জ্য, প্লাস্টিক ও গৃহস্থালি আবর্জনায় নদীর পানি অনেক স্থানে কালো হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে দুর্গন্ধে নদীতীরে দাঁড়ানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবেশ আন্দোলন বগুড়া জেলার সভাপতি সাহাবুদ্দিন সৈকত বলেন, ‘স্লুইসগেটের কারণে নদীর উৎসমুখ ভরাট হয়েছে। পরে প্রবাহ কমেছে। এখন শহরের প্রায় সব ড্রেন নদীতে পড়ছে। প্রবাহ কমেছে, দখল বেড়েছে, দূষণ জমেছে– তিনটি সংকট একে অপরকে আরও তীব্র করছে।’

আগের প্রকল্পে ফেরেনি স্রোত
করতোয়া পুনরুদ্ধারে গত এক যুগে একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল মেলেনি। ২০১৮ সালে প্রায় ২ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। পরে সংশোধিত প্রস্তাব তৈরি হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২৪ সালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৭ কিলোমিটার পুনঃখনন, ওয়াকওয়ে ও তীর সংরক্ষণের কাজ করা হয়। কিন্তু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরেনি। এবার ১ হাজার ১২২ কোটি টাকার নতুন প্রকল্পে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার নদীপথ পুনঃখননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর সঙ্গে থাকবে তীর সংরক্ষণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং নদী উন্নয়ন কার্যক্রম।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, ‘নদীটি বর্তমানে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। পুনঃখননের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।’ বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ বলেন, ‘করতোয়ার সংকট বহু কারণের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে। নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পানির ধারণ ক্ষমতা বাড়বে। স্লুইসগেট খোলা বা সম্প্রসারণের বিষয়েও মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

‘শুধু খনন নয়, আগে পানি নিশ্চিত করতে হবে’
পরিবেশবাদীরা বলছেন, করতোয়ার মূল সংকট পানিপ্রবাহ। সেটি সমাধান ছাড়া খনন টেকসই হবে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ফজলে রাব্বি ডলার বলেন, ‘নদীর প্রাণ যদি পানিপ্রবাহ হয়, তাহলে সেই প্রবাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি কেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই? গোবিন্দগঞ্জের স্লুইসগেট ভাটিতে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে আগে সমীক্ষা হওয়া দরকার। শুধু খনন করে কোনো নদীকে বাঁচানো যায় না। নদী বাঁচে প্রবাহ, দখলমুক্ত তীর এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে।’ তিনি আরও বলেন, ‘করতোয়া রক্ষায় আমরা সাধারণ মানুষকে নিয়ে ১২৩ কিলোমিটার মানববন্ধন করেছি। এখন সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
 

আরও পড়ুন

×