চিকিৎসক সংকট আর প্রেষণের জালে বেহাল স্বাস্থ্যসেবা
কালীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬ | ০৮:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার একমাত্র ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল সংকট, চিকিৎসক স্বল্পতা, দীর্ঘদিনের শূন্য পদ এবং প্রেষণ (ডেপুটেশন) ব্যবস্থার জটিলতায় স্বাস্থ্যসেবা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের বাস্তব চিত্র এতটাই নাজুক যে ফুল বাগানের মালী চালাচ্ছেন অ্যাম্বুলেন্স, আর ভেষজ বাগানের পরিচর্যাকারী পালন করছেন স্টোরকিপারের দায়িত্ব। বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ থাকে অপারেশন কার্যক্রম। ফলে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসাস্থল এই হাসপাতাল এখন নিজেই যেন ‘রোগীতে’ পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে ছয় বছর ধরে স্টোরকিপারের পদ শূন্য। এ দায়িত্ব পালন করছেন হারবাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মাহবুবার রহমান। দুটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও কোনো চালক নেই। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পর খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতিতে মালী মিলন হোসেন অ্যাম্বুলেন্স চালকের দায়িত্ব পালন করছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এখানে ৪৩ জন চিকিৎসকের থাকার কথা থাকলেও কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২১ জন। মেডিসিন, গাইনি, অর্থোপেডিক ও শিশুরোগসহ ১১টি বিশেষজ্ঞ পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ৫ জন। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
জনবল সংকটের মধ্যেও কয়েকজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী বছরের পর বছর কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত অন্তত তিনজন উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রেষণে অন্য জেলায় অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে জামাল ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. ইয়াসমিন আরা কুষ্টিয়ার মিরপুরে, কোলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. জয়নাল আবেদিন দৌলতপুরে এবং রাখালগাছী ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডা. মনিরুজ্জামান মিরপুরে কর্মরত রয়েছেন।
মোবাইল ফোনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে থাকা জয়নাল আবেদিন বলেন, স্ত্রী দৌলতপুরে একই চাকরি করেন। ছেলেমেয়ে, বাবা-মাসহ পরিবারের দেখাশোনার জন্য প্রেষণে সেখানে আছেন। কুষ্টিয়ার মিরপুরে থাকা ইয়াসমিন আরা জানান, দুটি ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাই ৮ বছর প্রেষণে মিরপুরে রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি কাগজে তাদের কর্মস্থল কালীগঞ্জ হলেও বাস্তবে তারা দীর্ঘদিন ধরে এখানে সেবা দিচ্ছেন না। অথচ নিয়মিত বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রেষণ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ বছরের পর বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. অরুণ কুমার দাস বলেন, ‘বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রেষণে বাইরে থাকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিষয়ে ইতোমধ্যে জেলা সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’ ইউএনও রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, ‘হাসপাতালের বিভিন্ন সংকট সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ঝিনাইদহের সিভিল সার্জন ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘দীর্ঘদিন নিয়োগ না হওয়ায় জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। প্রেষণে থাকা চিকিৎসকদের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। চালক না থাকায় মালী দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালানোর বিষয়টিও সত্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’
স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমিটির সভাপতি মাওলানা আবু তালিব বলেন, হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা প্রয়োজন। বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হবে।’
- বিষয় :
- স্বাস্থ্যসেবা
