ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ঈদের ছুটি শেষে কারখানায় গিয়ে জানলেন চাকরিচ্যুত

ঈদের ছুটি শেষে কারখানায় গিয়ে জানলেন চাকরিচ্যুত
×

ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে গতকাল শনিবার সাভারে আল মুসলিম গ্রুপের পোশাক কারখানার সামনে শ্রমিকদের বিক্ষোভ সমকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাভারের আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি পোশাক কারখানার ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। ঈদের ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে এসে হঠাৎ ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেখতে পান শ্রমিকরা। প্রতিবাদে গতকাল শনিবার সকালে কারখানার প্রধান ফটকের সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন তারা। এ ছাড়া ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার উলাইল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবরোধ করলে ১ ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানান, ছাঁটাই করা শ্রমিকদের এক মাসের বেতন পরিশোধ করেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। তবে আন্দোলনকারী শ্রমিকদের দাবি, ২৬ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই করা শ্রমিকদের তিন মাসের বেতন পরিশোধ করতে হবে। অবিলম্বে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে না নিলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন শ্রমিকরা।

এই কারখানায় ১৩ বছর ধরে সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত আফানুর জানান, হঠাৎ মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তাঁকে ছাঁটাই করা হয়েছে। সকালে কাজে এলে কর্তৃপক্ষ কারখানায় ঢুকতে দেয়নি। একই ধরনের অভিযোগ করেন, ৭ বছর ধরে কর্মরত রোজিনা আক্তার, ২ বছর ৫ মাস ধরে কর্মরত মো. রকিবুল্লাহ ও ট্রেনিং সেন্টার থেকে সদ্য লাইনে আসা আছিয়া আক্তার। তাদের অভিযোগ, তিন মাস ১৩ দিনের পাওনা দিয়ে ছাঁটাই করার নিয়ম থাকলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ তা মানেনি।

বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে দুপুরের দিকে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ও ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উলাইল এলাকায় আল-মুসলিম গ্রুপের একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানার সামনে এই কর্মসূচি পালন করেন তারা।
ভুক্তভোগী শ্রমিকরা জানান, কোনো নোটিশ ছাড়াই কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের বের করে দিয়েছে। ঈদের ছুটি শেষে গতকাল শনিবার সকালে কারখানায় কাজে যোগদান করতে গেলে আইডি কার্ড কেড়ে নেয় কর্তৃপক্ষ।

সুইং অপারেটর মাকসুদা আক্তার বলেন, ‘সকালে অফিসে যখন কার্ড পাঞ্চ করতে গিয়েছি, তখন দেখি আমার পাঞ্চ নিচ্ছে না। এ সময় কর্তৃপক্ষ আমাদের পাওনা টাকা-পয়সা না দিয়েই জোর করে কারখানা থেকে বের করে দিয়েছে। এই অবস্থায় আমরা কোথায় চাকরি পাব, কীভাবে চলব।’

ভুক্তভোগী শ্রমিকরা দাবি করেন, ঈদের ছুটির আগে তাদের ২০ দিনের বেতন দেয়। তাদের কোনো নোটিশ না দিয়ে ছাঁটাই করে তারা বলে কারখানায় কাজ নেই। অথচ তাদের ওভারটাইম করতে হয়। ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শ্রম আইন যথাযথভাবে মানা হয়নি। ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষের ব্যবসায়িক মন্দা ও ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার দাবি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।
একাধিক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতা জানান, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ২০ ধারা অনুসারে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিক ছাঁটাই করতে 
পারেন। কিন্তু ২১ ধারা অনুসারে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের পরে কারখানা কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন সাপেক্ষে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হবে কিনা সেটির কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
আল-মুসলিম গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আবু রায়হানের ভাষ্য, শ্রমিকদের ২০ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই করা হয়েছে এবং তাদের পাওনা এক মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের ২৬ ধারায় তিন মাসের বেতন পরিশোধের বিষয়ে শিল্প পুলিশের সঙ্গে আলোচনা হয়নি এবং তিন মাসের বেতন দেবেন না তারা। শুধু এক মাসের বেতন কেউ না পেয়ে থাকলে তাদের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, কারখানায় অতিরিক্ত শ্রমিক হলে যাদের সর্বশেষে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের ছাটাই করতে হবে। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ ৫ থেকে ১০ বছর এবং তারও অধিক সময় ধরে চাকরি করা শ্রমিকদের ছাঁটাই করেছে। এই ঘটনায় মানববন্ধন ও শ্রমিক সমাবেশ করেছেন তারা। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ছাঁটাই করা শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে। অনথ্যায় কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবি আদায় করা হবে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক অসন্তেষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্ত করেছে। এ ছাড়া মালিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দাবি মেনে নিয়েছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, আল-মুসলিম গ্রুপের তিনটি কারখানা থেকে একযোগে ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাভার পৌর এলাকার উলাইল মহল্লার একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড কারখানা থেকে ১ হাজার ২৮৬ জন, রেডিও কলোনি এলাকার প্যাসিফিক ব্লু জিন্স 
ওয়্যার কারখানার ৫২৯ জন ও আশুলিয়ার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস কারখানার ৫৩ জন শ্রমিক-কর্মকর্তা রয়েছেন।

আরও পড়ুন

×