ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

গজারি বনে সিসার কারখানা

গজারি বনে সিসার কারখানা
×

গাজীপুরে গজারি বনের ভেতর গড়ে তোলা অবৈধ সিসার কারখানা। ছবি: সমকাল

ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন, গাজীপুর

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৭:২৯

গাজীপুরে গজারি বনের গহীনে গড়ে তোলা হয়েছে সিসা তৈরির অবৈধ কারখানা। রাত নামলেই সেখানে জ্বলে ওঠে ৪টি চুলা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পুরোনো ও ভাঙ্গা ব্যাটারি সংগ্রহ করে পুড়িয়ে সিসার ব্লক তৈরি করা হয়। রাতভর উৎকট দুর্গন্ধ আর ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় অতিষ্ট গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের মানসুরাবাদ এলাকার মানুষ। মানসুরাবাদ এলাকায় বনের ভেতর ইদ্রিছ পার্ক নামের স্থানে ওই কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। 

স্থানীয়রা জানান, আগেও কয়েকবার সেখানে সিসা তৈরির কারখানা স্থাপন করা হয়। প্রতিবারই প্রতিবাদের মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়। গত রোববার রাত থেকে আবার নতুন মালিকানায় চালু হয়েছে কারখানাটি। 

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মাওনা চৌরাস্তা থেকে পশ্চিম দিকে কালিয়াকৈর সড়কের শিমলাপাড়া ও শালদহপাড়ার মাঝামাঝি স্থানে ব্যক্তিগত জমিতে ইদ্রিছ পার্কের অবস্থান। চারদিকেই গজারি বন। এক কিলোমিটার দক্ষিণে আছে লোকালয়। পার্কের জমি ভাড়া নিয়ে অস্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করে কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছে।

জমির মালিক ইদ্রিছ আলী বলেন, প্রায় ১৪ বছর আগে আমি সেখানে ৭-৮ বিঘা জায়গা কিনেছি। আধুনিক মানের একটা প্রকল্প করার পরিকল্পনা রয়েছে। মালপত্র রাখার জন্য সম্প্রতি একজন জায়গাটা ভাড়া নেন। কিন্তু সেখানে যে সিসা তৈরি করা হবে তা আমি জানতাম না। জানলে ভাড়া দিতাম না।

স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি বগুড়ার নজরুল ইসলাম টুটুল ওই পার্কের জমি ভাড়া নিয়ে ফের সিসা উৎপাদন শুরু করেন। অভিযোগ আছে, স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহলকে ম্যানেজ করেই তিনি কারখানা চালু করেছেন। কারা সেই প্রভাবশালী সে বিষয়ে স্থানীয়রা মুখ খুলতে রাজি হননি।

গতকাল বুধবার সকালে গিয়ে দেখা যায়, যে ৪টি চুলায় রাতে সিসা গলানো হয়েছে সেখান থেকে ধোঁয়া উড়ছে। ১৫-২০ জন কর্মচারী কাজ করছে। তারা জানান, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাঙা ব্যাটারি সংগ্রহ করে এখানে এনে সিসা বানানো হয়। সেই সিসার পাটালি (চার কোণা ব্লক বা বার) বিভিন্ন চায়না কোম্পানিতে উচ্চ দামে সরবরাহ করা হয়। 

সিসা তৈরির কারখানাটির মালিক নজরুল ইসলাম টুটুল বলেন, এলাকার লোকজনকে নিয়েই কয়েকদিন আগে এটা শুরু করেছিলাম। আমরা কয়েকজন মিলে চালু করি। এর আগে অন্য কেউ হয়তো সিসা তৈরি করত। আমি নতুন এসেছি। 

জানা গেছে, এই সিসা কারখানার পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেই। উপজেলা প্রশাসন এমনকি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদেরও অনুমতি নেওয়া হয়নি। 

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফিন বাদল সমকালকে বলেন, ক্ষতিকর এমন সিসা তৈরির কারখানা গড়ে তুলতে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিতে পারে না। ওই কারখানার কোনো ছাড়পত্র নেই। তিনি বলেন, সিসা এমন একটি ধাতু যা কোনো খাদ্যের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে তা রক্তের সঙ্গে মিশে যায়। এক পর্যায়ে তা ব্লাড ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করে। সিসা রক্তে মিশলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মনোযোগের অভাব, বুদ্ধিমত্তা কমিয়ে দেয়। অ্যাসিডের তীব্র গন্ধ ও সিসার কণা শ্বাসকষ্ট, কাশি ও ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ সৃষ্টি করে। 

গতকাল বিকেলে শ্রীপুর উপজেলা কমিশনার (ভূমি) সাইদুল ইসলামের নেতৃত্বে সেখানে অভিযান চালানো হয়। তিনি বলেন, অভিযানে জব্দ করা মালপত্র ১৩ লাখ ১৬ হাজার টাকায় নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। এ সময় কারখানায় কাউকে পাওয়া যায়নি। আগেই সবাই পালিয়ে যায়। 

মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মতিউর রহমান বলেন, এ কারখানা সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। কেউ আমাকে জানায়নি। তিনি আরও বলেন, পরিবেশ ধ্বংসের জন্য এই একটা কারখানাই যথেষ্ট। প্রশাসন এটি বন্ধ করেছে, আর যেন না খোলে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আরও পড়ুন

×