দূষণে বিপর্যস্ত নগর-নদী, বাড়ছে উদ্বেগ
বর্জ্য অব্যবস্থাপনা
আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা এবং পৌরশহরের বর্জ্যের ভারে বিপন্ন নবীগঞ্জের শাখা বরাক নদী সমকাল
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) ও কুলাউড়া , (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার পরিবেশ বিপর্যয়ের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলছে। এই অঞ্চলের নদীর পানি থেকে শুরু করে ডাঙার মাটি-সবখানেই বর্জ্য অব্যবস্থাপনার চিত্র দৃশ্যমান। যখন যে যেখানে পারছে সেভাবেই ময়লা-আবর্জনায় ঠেসে দিচ্ছে নদীর বুক অথবা নগরীর বিভিন্ন এলাকার খালি জায়গা। নগরীর বর্জ্য অপসারণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরাও সেগুলো যথাস্থানে ফেলছেন না।
শুধু নদী বা খোলা জায়গা নয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সীমানা ঘেঁষেও জমানো হচ্ছে ময়লার স্তূপ। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম ও সীমাবদ্ধতা। এই অঞ্চলের নদী-নালা থেকে শুরু করে পরিত্যক্ত ভূমি-সবই যেন ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
ময়লার ভারে থমকে গেছে বরাক
হবিগঞ্জের প্রাণ-প্রকৃতির অন্যতম উৎস, এক সময়ের শাখা বরাক নদীটি ছিল প্রবল খরস্রোতা। সময়ের সঙ্গে নদীর বিভিন্ন অংশ দখলের মুখে সংকীর্ণ হয়ে গেছে। আর বর্জ্যের ভার সইতের না পেরে থমকে যাওয়া মৃতপ্রায় নদীটি বর্তমানে রয়েছে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটে। এখন এটিকে স্থানীয়রা খাল বলেই সম্বোধন করেন।
অবৈধ দখল ও ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে ক্রমেই অস্তিত্ব হারানোর পথে শাখা বরাক। এই নদীটি দিয়ে এক সময় চলাচল করত বড় বড় জাহাজ ও নৌকা। জেলার বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই নদীটির। এখন মৃতপ্রায় নদীটিতে পানির প্রবাহ নেই। বর্জ্যের ভারে থমকে গেছে এর গতি। বিভিন্ন সময় নদীটি রক্ষায় নানা কর্মসূচি পালিত হলেও সেভাবে আমলে নেয়নি কেউ।
ময়লার কারণে বর্তমানে শাখা বরাক নদীর পানি একেবারে কালো হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন খনন না করায় এবং শিল্পনগরী ও আশপাশের বাজার ও আবাসিক এলাকার বর্জ্যের ভারে বিপর্যস্ত নদীটি। বিষাক্ত পানির কারণে নদীতে এখন আর মাছের দেখা মেলে না; যার প্রভাব এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলাশয়জুড়ে পড়েছে।
সেচের জন্যও ব্যবহার করা যায় না শাখা বরাকের পানি। দূষণের তীব্রতায় ভেঙে পড়েছে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুব্যবস্থা। কোথাও এ নদীর পানি ব্যবহার করা হলে বিষক্রিয়ায় নষ্ট হচ্ছে জমির ফসল। নদীর আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, স্বাস্থ্যঝুঁকির ব্যাপক শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয়রা। নবীগঞ্জ শহরের বরাক নদীর তীরের মানুষ নদীর কাছে থেকেও তার সুবিধা ভোগ করতে পারছেন না। নদীর দূষিত পানি আর এর বুকে জমা বর্জ্যের দুর্গন্ধে নাকাল তারা।
স্থানীয়রা জানান, নবীগঞ্জ শহরের আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কলকারখানার দূষিত বর্জ্য শাখা বরাক নদীতে ফেলা হচ্ছে। এখানে গড়ে ওঠা অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নেই প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি)। যেসব কোম্পানিতে ইটিপি রয়েছে সেগুলো অতিরিক্ত খরচের ভয়ে নিয়মিত চালাচ্ছে না।
নবীগঞ্জ পৌরসভা, ডাকবাংলো, আক্রমপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা যায়, শিল্পবর্জ্যের দূষণে নাকাল শাখা বরাকের পানি মানুষের কোনো কাজে আসছে না। তবে নদীটি হারিয়ে গেলে প্রতিবেশ বিপর্যয় অনিবার্য।
এসব এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভারতের ত্রিপুরা থেকে সীমান্ত অতিক্রমকারী শাখা বরাক নদীর পানি কালো কুচকুচে হয়ে আছে। পানি থেকে প্রকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। নদীর দূষিত পানিতে মরে ভেসে আছে জলজপ্রাণী।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, শাখা বরাকের পানি যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে নবীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলার প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার হেক্টর বোরো জমিতে চাষাবাদ করা যেত নির্বিঘ্নে। পানির অভাবে প্রতিবছর কৃষকদের হিমশিম খেতে হয়।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জহিরুল হক শাকিল বলেন, শাখা বরাকসহ হবিগঞ্জের ৫টি নদী সম্পূর্ণভাবে বিপন্ন হয়ে গেছে শুধু শিল্পায়নের নেতিবাচক প্রভাবে। যে শিল্পায়ন এবং প্রবৃদ্ধি মানুষের জন্য, তাই যদি পানির উৎস মেরে ফেলে তাহলে এমন প্রবৃদ্ধি দরকার নেই।
নবীগঞ্জ পৌর এলাকার অনিকা রাণী পাল বলেন, ময়লা পানির দুর্গন্ধে ঘরে থাকা দায়। দীর্ঘদিন ধরে শাখা বরাক নদীর নবীগঞ্জ অংশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যস্নানের ঐতিহ্য রয়েছে। বর্তমানে এ নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ায় পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। বেহাল শাখা বরাক এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও কৃষি ছাড়াও কৃষ্টিকালচারকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল জানান, নদী, খাল, বিল, জলাশয়ে শিল্পবর্জ্য নিক্ষেপের ফলে এই অঞ্চলের পরিবেশে বিপর্যয় নেমে এসেছে। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সব ধরনের শিল্পবর্জ্য ‘উৎসে পরিশোধন’ বাধ্যতামূলক হলেও এই অঞ্চলে তা একেবারেই মানা হচ্ছে না। কলকারখানাগুলো শুরু থেকেই বেপরোয়াভাবে দূষণ চালিয়ে আসছে। এর বাস্তবতা শাখা বরাক ও সুতাং নদীসহ আশপাশের খাল বিলের চিত্র দেখলেই বোঝা যায়।
শহরের দিনারপুর কলেজের অধ্যক্ষ তনুজ রায় বলেন, পৌরসভার ময়লা ফেলার কোনো ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় শাখা বরাক নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। নদীর দূষণ রোধে নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে হবে। শাখা বরাক নদীর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
নবীগঞ্জের ইউএনও ও পৌর প্রশাসক রুহুল আমীন বলেন, শাখা বরাক নদীতে ময়লা আবর্জনা ফেলা ও অবৈধ দখলের বিষয়ে কেউ তাঁকে অভিযোগ দেয়নি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তিনি ব্যবস্থা নেবেন।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘেঁষা ভাগাড়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি
এদিকে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার রবিরবাজারে অবস্থিত পৃথিমপাশা পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পাশেই দীর্ঘদিন ধরে জমানো হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। বর্তমানে সেটিই ওই এলাকার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে এভাবে আবর্জনা ফেলা হলেও দেখার যেন কেউ নেই। আক্ষেপ করে এমনটাই জানান স্থানীয়রা।
বুধবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রবিরবাজারের বিভিন্ন স্থান থেকে আনা ময়লা-আবর্জনা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের খালি জায়গায় ফেলা হচ্ছে। প্লাস্টিক, পলিথিন, হোটেলের পচা-বাসি খাবারসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য জমে সেখানে বিশাল আবর্জনার স্তূপ তৈরি হয়েছে। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ আশপাশের এলাকায়। এতে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে আসা রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র রবিরবাজার। প্রতিদিন এখানে হাজারো ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগম ঘটে। সীমান্তবর্তী এলাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে শত শত রোগী পৃথিমপাশা পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসেন। সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের গা ঘেঁষেই গড়ে তোলা হয়েছে ভাগাড়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সরকারি জমির সীমানা আজও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে বিভিন্ন ব্যক্তি ধীরে ধীরে জায়গা দখলের চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া রবিরবাজারে ময়লা-আবর্জনা ফেলার নির্দিষ্ট কোনো স্থান না থাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের খালি জায়গাটি কার্যত ডাম্পিং প্লেসে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এলাকাবাসী জানান, বহুবার প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সীমানা নির্ধারণ, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং আবর্জনা অপসারণের দাবি জানিয়েছেন তারা। এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপদেখা যায়নি।
রবিরবাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র এই বাজার। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় এখানে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন পৃথিমপাশা স্বাস্থ্য ও পরিবার কেন্দ্রে। অথচ কেন্দ্রটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন দীর্ঘদিন থেকে উপেক্ষিত।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জেরিন আক্তার বলেন, সমস্যাটি দীর্ঘদিনের। সমাধানের জন্য বিভিন্ন সময়ে সিভিল সার্জনের পরিদর্শন, ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে বৈঠক এবং সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে এখানে কর্মরত আছেন। অনেক চেষ্টা করা হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
কুলাউড়া ইউএনও সানজিদা আক্তার বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
- বিষয় :
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
