ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বগুড়ার শিবগঞ্জ

প্রতিমন্ত্রী বললেন মিরাকল, প্রশাসন বলছে সুপারিশ

প্রতিমন্ত্রী বললেন মিরাকল, প্রশাসন বলছে সুপারিশ
×

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৯:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকা (বগুড়া-২ আসন) শিবগঞ্জ ভেঙে মোকামতলা নামে নতুন একটি উপজেলা গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি শিবগঞ্জে ‘মীরবাড়ী’ এবং নবগঠিত মোকামতলায় ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’ নামে নতুন চারটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে (গেজেট) এসব নামকরণ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা চলছে। 
স্থানীয়রা বলছেন, স্বর্ণগ্রাম বাদে তিনটি ইউনিয়নের নাম প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক বাড়ি ও দুই ছেলের নামে রাখা হয়েছে। 

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান জানান, তিনি উপজেলা প্রশাসনের পাঠানো সুপারিশ ও প্রস্তাবের আলোকে গণশুনানি শেষে নতুন ইউনিয়নের গেজেট প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী আমাকে কিছুই বলেননি।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩ জুন শিবগঞ্জ উপজেলার এক সভায় বিএনপির এক নেতা ইউনিয়নগুলোর নামকরণের বিষয়ে প্রস্তাব করলে সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন থেকে নামগুলো লিখিত প্রস্তাব আকারে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। জেলা প্রশাসক ১১ জুন মীরবাড়ি ইউনিয়ন এবং ১৪ জুন সীমান্ত ইউনিয়ন ও দিগন্ত ইউনিয়ন নামে গেজেট জারি করেন।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউর রহমান বলেন, নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রস্তাব এলে এ বিষয়ে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সুপারিশ জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো হয়। নাম কারা প্রস্তাব করেছেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘কয়েকজন ব্যক্তি নামগুলো প্রস্তাব করেন। তবে কারও নাম আমার মনে নেই।’  

বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও এলাকার অনেকে বলছেন, প্রতিমন্ত্রীর পৈতৃক ‘মীরবাড়ি’ এবং তাঁর দুই ছেলে ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্তে’র নামেই নতুন ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। 
শিবগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সভাপতি খালিদ হাসান আরমান বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর ছেলে ও বাড়ির নামে ইউনিয়ন পরিষদ করায় এলাকার মানুষ খুশিই হয়েছেন। ছেলের বা বাড়ির নামে ইউনিয়নের নাম করায় দোষের কিছু নয়, বরং ভালো হয়েছে।’ 

বগুড়া জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত গ্রেজেটে বলা হয়, শিবগঞ্জ উপজেলা ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় প্রশাসনিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে সীমান্ত ইউনিয়ন, দিগন্ত ইউনিয়ন ও মীরবাড়ি নামে এই তিনটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়। এ ছাড়া স্বর্ণগ্রাম নামে আরেকটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়। 

নবগঠিত মোকামতলার আওতাধীন সৈয়দপুর ইউনিয়ন ভেঙে গঠিত সীমান্ত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত মৌজাগুলো হলো– মানকৈর, ভবানীপুর, অভিরামপুর, খেরুয়াপাড়া, কিশোরীপুর, জগন্নাথপুর, আমঝুপি, জীবনপুর, কুকি কালিদাস ও কুকি জগন্নাথপুর। ১১টি মৌজা নিয়ে গঠিত এ ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৬ হাজার ২৬৭ জন।
দেউলী ইউনিয়ন ভেঙে গঠিত দিগন্ত ইউনিয়নের মৌজাগুলো হলো– ভরিয়া (ভৈরা), মেঘাখর্দ্দ, আলমপুর, রহবল, সাওয়ালদহ, কৃষ্ণপুর, তালিবপুর ও বোয়ালমারী। মোট ৮টি মৌজা নিয়ে গঠিত এ ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৭ হাজার ৭৫৯ জন।

শিবগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের অংশ নিয়ে মীরবাড়ি ইউনিয়ন গঠন করা হয়। একই সঙ্গে শিবগঞ্জ পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণ এবং নতুন ইউনিয়ন গঠনের কারণে বিহার, রায়নগর, বুড়িগঞ্জ, কিচক ও আটমুল ইউনিয়ন পুনর্গঠন করা হয়েছে।

মীরবাড়ি ইউনিয়ন ফেনীগ্রাম, সৈয়দপুর, চন্দনপুর, দোপাড়া, তেয়াইল, গোরনা, ধামাহার, বাদলদীঘি, বেতগাড়ী, রামকান্দি, চকগোপাল, ডাবুর, চককানু, হরিপুর ও গোপীনাথপুর– এই ১৫টি মৌজা নিয়ে গঠিত হয়েছে। নতুন ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা ১৮ হাজার ৯২৪ জন।

মীর শাহে আলমের দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত লন্ডনে পড়াশোনা শেষে এক বছর আগে দেশে ফিরে রাজনীতি এবং বাবার ব্যবসা দেখাশোনা শুরু করেন। দেশে ফেরার পর তাঁকে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক করা হয়। ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্ত লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। 

গত ৮ জুন শাকরুল আলম সীমান্ত সিলেকশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য এর পরদিনই তিনি পদত্যাগ করেন। 
এ বিষয়ে জানতে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মোবাইল ফোনে গতকাল একাধিকবার কল দিলেও তিনি ধরেননি। অবশ্য তিনি এ নিয়ে সংসদে বিস্তারিত কথা বলেছেন। 

বগুড়ার শিবগঞ্জে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বাড়ির নামফলক 	-সমকাল
 
নামের মিলকে সংসদে অলৌকিক বললেন প্রতিমন্ত্রী 
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকাধীন নতুন তিন ইউনিয়নের নাম নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে। গতকাল সোমবার সংসদের বৈঠকে বিরোধী দল বলে, প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামে নবগঠিত দুই ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ হয়েছে। তবে প্রতিমন্ত্রী তা অস্বীকার করে দাবি করেন, অলৌকিকভাবে তাঁর ছেলেদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে।

ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনে কয়েকটি গ্রাম বা সংলগ্ন মৌজা বা গ্রামের সমন্বয়ে একটি ওয়ার্ড এবং ৯টি ওয়ার্ডের সমন্বয়ে একটি ইউনিয়ন ঘোষণা করতে পারেন। নবগঠিত ইউনিয়নের নাম নির্ধারণ করবেন জেলা প্রশাসক। তবে কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যাবে না। 

আইনে এই বিধান থাকার পরও কীভাবে প্রতিমন্ত্রীর সন্তানদের নামে ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে– এই প্রশ্ন সংবাদমাধ্যমে আসার পর গতকাল সোমবার মাগরিবের নামাজের বিরতির আগে সম্পূরক বাজেট আলোচনায় বিষয়টি সংসদে তোলেন জামায়াতের এমপি শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তাঁর এলাকায় একটি ইউনিয়নে মীর বংশের নামে মীরবাড়ি নামকরণ করেছেন। তাঁর দুই সন্তান সীমান্ত ও দিগন্ত নামে দুটো ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী নাকচ করেছেন। আমরা বাহবা দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী যা চান সেটাই তো মন্ত্রীদের চাওয়ার কথা। বিগত ফ্যাসিস্ট সময়ে নাম সংশোধনী করতে অনেক সময় কেটে গিয়েছিল। এখন একই সংস্কৃতি আমাদের মাঝে ফিরছে।’ 

বিরতির পর প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমকে কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগ দিতে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি অনুরোধ করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে। এ পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রীকে ফ্লোর দেন স্পিকার। 
প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাঁর ছেলেদের নামে নয়, স্থানীয়ভাবে প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই এবং গণশুনানি করে এলাকার নামে নবগঠিত ইউনিয়ন দুটির নামকরণ করেছে জেলা প্রশাসক। 

প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, নবগঠিত মোকামতলা ইউনিয়নে সৈয়দপুর ইউনিয়ন পরিষদ আয়তনে অনেক বড়। এই ইউনিয়ন ভেঙে সীমান্ত নামে ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছে। কারণ গাবতলী এবং সোনাতলা উপজেলার ইউনিয়নটি সীমান্তবর্তী। আরেকটি ইউনিয়নের নাম ছিল দেউলী। তা গাইবান্ধা জেলার সীমান্তবর্তী। দূরবর্তী হওয়ায় নাম দেওয়া হয়েছে দিগন্ত।

নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম ১২টি প্রতিষ্ঠানের মালিক। এর একটি মীর সীমান্ত ফিলিং স্টেশন, আরেকটি মীর দিগন্ত ট্রেডিং এজেন্সি।
তবে সংসদে সমালোচনার কৈফিয়তে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “অলৌকিকভাবে আমার সন্তানদের নাম ইউনিয়ন পরিষদের নামের সঙ্গে মিলে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমার সন্তানদের নাম হচ্ছে– মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। আমার যদি ইচ্ছা থাকত, তাহলে জেলা প্রশাসককে বলতাম ‘নাম রাখেন মীর সীমান্ত, না হলে মীর দিগন্ত’। কিন্তু নামের আগে তো মীর নেই।” 

সরকারি দলের এমপিরা এ সময় টেবিল চাপড়ে নামের সমর্থন জানান প্রতিমন্ত্রীকে। মীর শাহে আলম তখন বলেন, ‘আল্লাহ বাঁচাইছে যে মাননীয় সংসদ সদস্য যে বলেননি বিজিবির সীমান্ত ব্যাংক লিমিটেড, ওটা আমার ব্যাংক। তিনি যে দয়া করে বলেননি, খুলনা থেকে পার্বতীপুরে যে ট্রেন যায় সীমান্ত এক্সপ্রেস, সেটিও আমার ট্রেন। তিনি যে দয়া করে বলেননি, গুলশান ১-এ যে দিগন্ত টাওয়ার রয়েছে, সেটিও আমার।’ তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দিগন্ত ও সীমান্ত নামের এলাকা স্থাপনার তালিকা তুলে ধরেন সংসদে।
 

আরও পড়ুন

×