সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেন প্রকল্প
চার বছরে অগ্রগতি সামান্য ভূমি অধিগ্রহণ বড় অন্তরায়
ধীরগতিতে চলছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নির্মাণকাজ। সম্প্রতি তোলা সমকাল
মুকিত রহমানী, সিলেট
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে এক বছরের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ করে চলতি বছর কাজ শেষ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। সিলেট অংশে গত চার বছরে ভূমি অধিগ্রহণ হয়েছে মাত্র এক-চতুর্থাংশ। এর মধ্যে অনেক ভূমির স্থাপনা আবার সরানো হয়নি। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজও করতে পারছে না।
২০২১ সালে প্রকল্পটি নেওয়া হলেও নানা কারণে ঠিকাদার নিয়োগ হয় দুই বছর পর ২০২৩ সালে। মেগা এ প্রকল্প কাজে ধীরগতির কারণে একদিকে যেমন যাত্রীরা বছরের পর ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে কবে কাজ শেষ হবে– তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার গঠনের পর সড়কের কাজ দ্রুত করতে তাগাদা দিচ্ছেন সিলেটের দুই মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং আরিফুল হক চৌধুরী।
প্রকল্পের তথ্যমতে, সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে ২০৯ কিলোমিটার ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। মূল প্রকল্প প্রস্তাবে ৬৬টি সেতু, ৩০৫টি কালভার্ট, আটটি ওভারপাস, ২৬টি ফুট ওভারব্রিজ, ৩৭টি ইউটার্ন ও আটটি রাউন্ড অ্যাবাউট (গোলচত্বর) নির্মাণ করার কথা। এর মধ্যে সিলেট অংশে ১১৭ কিলোমিটারের মধ্যে জায়গা অধিগ্রহণ করার কথা প্রায় সাড়ে ৫০০ একর। সেখানে হয়েছে এক-চতুর্থাংশ। অনেক জায়গা আবার খালি করা হয়নি।
গত রোববার সিলেট অংশের সড়কের সাদিপুর এলাকার গজিয়া সেতুর পাশে কাজ করতে গেলে বাধা দেন সেখানকার ভূমি মালিকরা। মহাসড়কের ওসমানীনগর এলাকার ইদ্রিস আলী জানান, তাঁর ভাই, তিনিসহ অনেকে জমি অধিগ্রহণের টাকা পাননি।
রোববার সরেজমিন দেখা গেছে, দক্ষিণ সুরমার লালাবাজার ইউনিয়নের সাতমাইল নামক স্থানে কাজ চলছে। এরপর কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো কাজ নেই। সড়কটির শেরপুর পর্যন্ত তাজমহরমপুর, বরকাপন, দয়ামির, সোয়ারগাঁও, কুরুয়া, আহমদনগর, কুতুবপুর, কলারাই, ভূরুঙ্গা এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে কাজ চলছে। কোনো স্থানে ব্রিজ ও কালভার্ট এবং কোনো স্থানে মাটি ভরাট ও রাস্তার একাংশ ঢালাই কিংবা মাটি রোলার করা হচ্ছে। একমাত্র আহমদনগর এলাকায় পুরো রাস্তার কাজ ভেসে উঠেছে।
সিলেট অংশের প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী দেবাশীষ রায় জানান, ১০ কিলোমিটার জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। চলতি বছরে এটি শেষ করতে সবাই কাজ করছেন। ঠিকাদার নিয়োগ হয় দুই বছর পর। তাঁর অংশে ১৫-১৬ শতাংশ কাজ হয়েছে। ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার প্রত্যাশা করেন তিনি।
মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ঠিকাদার নিয়োগ হয় ২০২৪ সালে। সেখানে অধিগ্রহণ হয়েছে খুবই সামান্য। যেটুকু হয়েছে, তাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। খালি জায়গায় মাটি ভরাট ও প্রশস্তকরণের কাজ চলছে। শেরপুর থেকে নবীগঞ্জ উপজেলার মজলিসপুর পর্যন্ত নতুনবস্তী (ব্রাহ্মণগ্রাম), শেরপুর গ্রামের কাছে ব্রিজ নির্মাণ ও রাস্তা প্রশস্তকরণে মাটি ভরাটের কাজ চলছে। হবিগঞ্জের অধিকাংশ অংশের কাজও একইভাবে চলছে।
মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ ৩৫ কিলোমিটার প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন জানান, তাঁর কিছু জায়গা অধিগ্রহণ হলেও বুঝে পাননি। জমির জন্য প্রকল্পে দেরি হচ্ছে।
সিলেট অংশে ১৪ কিলোমিটারের কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইএনজেড-টিসিসিএল যৌথ কাজের প্রকল্প ব্যবস্থাপক উদয়ন চক্রবর্তী বলেন, ‘৪৮ মাস কাজের মেয়াদ হলেও ৩৭ মাস পর পাঁচ কিলোমিটার জায়গা বুঝে পাইনি। ভূমি জটিলতার কারণে কাজ বিলম্ব হচ্ছে। আগে নানা সমস্যা থাকলেও এখন আমাদের জনবল, সরঞ্জামসহ নির্মাণসামগ্রী পর্যাপ্ত রয়েছে। কয়েকটি ব্রিজের কাজ শুরু করেছি। কিন্তু জায়গা নিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’
সিলেট পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মইনুল ইসলাম জানান, মহাসড়কের সিলেটের কিছু অংশসহ বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চলায় যাত্রীদের ভোগান্তি লেগেই আছে। ভূমি জটিলতার অবসান করে দ্রুত কাজ করার দাবি করেন তিনি।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগ জড়িত। অতীতে ভূমি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের বদলির কারণে বিলম্ব হয়। কিন্তু এখন আমরা দ্রুত কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের পর অনেকে মামলাও করেছেন। নোটিশ করলে জবাব দেন না। কেউ আবার কাগজপত্র না দেখাতে পারার কারণে ক্ষতিপূরণ পেতে বিলম্ব হওয়ায় সেই ভূমি ছাড়তে চান না। আশা করছি কয়েক মাসের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হবে। ইতোমধ্যে একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
- বিষয় :
- প্রকল্প
