ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

৪৬৩ স্কুলে প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ব্যাহত, কমছে শিক্ষার্থী

৪৬৩ স্কুলে প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাঠদান ব্যাহত, কমছে শিক্ষার্থী
×

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৮:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

এমনিতেই বছরে ৪-৫ মাস বন্ধ থাকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তাঁর ওপর স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় ভাটা পড়েছে। এই অবস্থায় কওমি মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকদের তৎপরতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ক্রমশ কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেরপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭৪১টি প্রধান শিক্ষকের পদ রয়েছে। যার মধ্যে ৪৬৩টি পদে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। সদর উপজেলার ২০৪ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৬টি, শ্রীবরদী উপজেলার ১৯৬ বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২২টি, ঝিনাইগাতীর ১০১টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৮টি নালিতাবাড়ীর ১২১ বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮২টি এবং নকলার ১১৯ বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮১টিতে নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্রমশ কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যা।
ঝিনাইগাতী উপজেলার দক্ষিণ দিঘীরপাড় উচ্চ বিদ্যালয়ে দুই বছর আগেও দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ছিল। এই বিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা মাত্র ৫২ জন। কোনো শ্রেণিতে ১০, আবার কোনো শ্রেণিতে মাত্র ৬-৭ জন করে শিক্ষার্থী আছে।

প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দিন আল আজাদ জানান, অতিরিক্ত কাজের চাপ সামলে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সহকারী শিক্ষক হওয়ায় অনেক যন্ত্রণা। সহকর্মীদের কাছ থেকে সম্মান পাওয়া যায় না। তাঁর ভাষ্য, স্থানীয় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকরা অভিভাবকদের বুঝিয়ে দুর্বল করে শিক্ষার্থীদের ভাগিয়ে নিচ্ছেন। আবার এনজিও স্কুল, কিন্ডারগার্টেন  থাকায় তার প্রভাব পড়ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাই দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।

একই উপজেলার তাওয়াকুচা সীমান্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুন্নাহার জানান, ২০২৪ সালে তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় শিক্ষার্থী ছিল দেড় শতাধিক। এখন আছে মাত্র ৬৬ জন। স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় তাদের সমস্যা হচ্ছে।
সদর উপজেলার চরমোচারিয়া ইউনিয়নে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০টি। এর মধ্যে ১৭টিতে নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। স্থানীয় ইউপি সদস্য মিজানুর রহমানের ভাষ্য- আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন, শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিতেন। এখন এসব কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে না। বিপরীতে বাড়ি বাড়ি যান কওমি মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন শিক্ষকরা। গ্রামের সহজ-সরল মানুষ তাদের কথায় বিশ্বাস করে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

দিন দিন শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ জানিয়েছেন কেন্দুয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফুল মাহমুদ। তাঁর মতে, বিদ্যালয় একটি পরিবারের মতো। পরিবারের অভিভাবক না থাকলে যেমন সন্তান ছন্নছাড়া হয়, তাদের দশাও তেমন হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বছরে ৪-৫ মাস বন্ধ থাকে। অথচ মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেন প্রায় সারাবছরই খোলা থাকে। এই কারণেও শিক্ষার্থী কমছে। তাঁর অভিমত, উপবৃত্তি বাদ দিয়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করলে চরাঞ্চলের বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বাড়বে। কারণ দরিদ্র অভিভাবকরা দুপুরের খাবারের নিশ্চয়তা পেলে সন্তানদের স্কুলে পাঠাবেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফারহানা পারভীনের সঙ্গে। তিনি জানান, স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকলে অনেক সমস্যা হয়। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদের দিক থেকে একজন সহকারী শিক্ষক। তিনি অতিরিক্ত কাজের চাপে পড়ে ক্লান্ত হয়ে পাঠদান করাতে পারেন না। ফলে একটি বিদ্যালয়ে একজন প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষক পাঠদান করতে পারেন না।
শেরপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ সায়েদুল ইসলামের ভাষ্য, নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতি এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ হবে। এই বিধিমালা চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু একটি মামলার কারণে পদোন্নতিযোগ্য শূন্যপদ পূরণের জট খুলছে 
না। প্রধান শিক্ষক শূন্যতায় শিক্ষার্থী কমে 
যাওয়া এবং পাঠদান ব্যাহত হওয়াসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, নকলা এবং নালিতাবাড়ী উপজেলায় স্কুল ফিডিং পাইলট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এতে শিক্ষার্থী আস্তে আস্তে বাড়ছে। সব বিদ্যালয়ে খাবার চালু হলে এবং প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ হলে শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
 

আরও পড়ুন

×