এনজিওর ঋণ পরিশোধেও মিলছে না মুক্তি
জয়পুরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কথা ছিল ঋণের বকেয়া টাকা পরিশোধ করলেই মামলা প্রত্যাহার করবে এনজিও কর্তৃপক্ষ। সেই আশ্বাসে সম্পত্তি বন্ধক রেখে পুরো পাওনা পরিশোধও করেন খামারি শামসুর রহমান (৭৪)। ঋণ শোধের পরও মামলা প্রত্যাহার হয়নি। উল্টো এখনও নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে তাঁকে। এতে প্রচণ্ড ভোগান্তি ও মানসিক চাপের মধ্যে দিয়ে দিন কাটছে জয়পুরহাটের কালাই পৌর শহরের পাঁচশিরা বাজার এলাকার এই প্রবীণ খামারির।
ভুক্তভোগী শামসুর রহমানের অভিযোগ, ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি এনজিওর (প্রগতি) কালাই শাখা থেকে ‘পোলট্রি খামার’ পরিচালনার জন্য ৩ লাখ টাকা ঋণ নেন। ওই অর্থে ব্রয়লার মুরগির খামার সম্প্রসারণ করেন। করোনাকালে বাজারে ব্রয়লার মুরগি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা ছড়িয়ে পড়লে ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নামে। বিক্রির উপযুক্ত অবস্থায় থাকা বিপুল সংখ্যক মুরগি নষ্ট হয়ে যায়। এতে তিনি আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন।
প্রথমদিকে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলেও পরে আর তা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে এনজিওটি। তখন তাদের দাবি ছিল প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার টাকা।
শামসুর রহমান জানান, মামলা দায়েরের পর এনজিওটির তৎকালীন কর্মকর্তারা তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, ঋণের মূল টাকা পরিশোধ করলে সুদ মওকুফ করা হবে এবং মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। সেই আশ্বাসে তিনি বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে ঋণের টাকা পরিশোধ করেন।
তাঁর ভাষ্য, ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর নগদ ৬৫ হাজার টাকা এবং সঞ্চয়ের অর্থসহ মোট ৭১ হাজার ২০০ টাকা সরাসরি শাখা কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়। আদালতের মাধ্যমে নয়, পাস বইয়ের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করে এনজিও কর্তৃপক্ষ। এরপরও মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘ঋণের পুরো টাকা শোধ করেছি। তারপরও মাসের পর মাস আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। বাদীপক্ষ অনেক সময় আদালতে উপস্থিতও থাকে না। আমাকে নিয়মিত যেতে হয়। খামার শেষ হয়ে গেছে, এখন মামলা নিয়ে হয়রানি হচ্ছি।’
১৯৯৮ সালে পোলট্রি খামার গড়ে তুলেছিলেন শামসুর রহমান। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় সফলভাবে ব্যবসা চালানোর পর ২০২১ সালে ঋণ নেন। করোনার প্রভাবে ব্যবসা ভেঙে পড়ে। তিনি বলেন, ‘জীবনের সব সঞ্চয় খামারে ছিল। ব্যবসা শেষ হয়ে গেলেও মামলা থেকে রেহাই পাচ্ছি না। এখন এনজিও অফিসে গেলে আগের কর্মকর্তাদের কাউকেই পাই না। নতুনরা কিছু জানেন না বলে দায় এড়িয়ে যান।’
এ বিষয়ে এনজিও মাইক্রোফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখার বর্তমান ব্যবস্থাপক মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘মামলা প্রত্যাহারের কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল কিনা, সে বিষয়ে আমার জানা নেই। আমি নতুন যোগদান করেছি। বিষয়টি বর্তমানে আদালতের অধীনে রয়েছে। আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী লক্ষ্মণ শীল বলেন, ঋণ পরিশোধের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। ঋণের বিপরীতে দায়ের করা চেক ডিজঅনার মামলা এখনও প্রত্যাহার করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘ঋণের টাকা আদায় হয়ে যাওয়ার পরও মামলা চালিয়ে যাওয়া আসামিকে অযথা হয়রানির শামিল। বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হয়েছে।’
এনজিওটির আইনজীবী সারোয়ার হোসেন বকুল জানান, ঋণের মূল টাকা পরিশোধের নির্ধারিত তারিখের মধ্যে খামারি জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই টাকা পরিশোধের পরও মামলা চলমান আছে। বাদীপক্ষের আদালতে উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাব না দিয়ে এনজিও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
ইউএনও শামীম আরা বলেন, ‘খামারি যদি ঋণের টাকা পরিশোধ করে থাকেন, তাহলে মামলা কেন ঝুলে থাকবে, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- ঋণ
