হানিকুইনে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন
সুনামগঞ্জের পাহাড়ি অঞ্চলে আবাদ করা হানিকুইন আনারস সমকাল
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জিআই পণ্যের স্বীকৃতি অর্জন আর বিদেশের ফলের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে সুনামগঞ্জের দুর্গম অঞ্চলের সুমিষ্ট আনারস হানিকুইন। তবে দীর্ঘ সময় আলোচনায় না থাকায় সেভাবে পরিচিতি পায়নি বিশেষ এই আনারস।
ওপারে ভারতের মেঘালয়ের পুণ্যনগর এলাকা, এপারে বাংলাদেশের রঙ্গারচর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনপদ হাসাউড়া, রসুলপুর ও দর্পগ্রাম। সবুজ টিলার ভাঁজে ভাঁজে যতদূর চোখ যায়, কেবলই আনারসের বাগান। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের কৃষকেরা চাষ করে আসছেন বিশেষ এক জাতের আনারস, যা স্বাদ, সুগন্ধ ও গুণগত মানের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে সুস্বাদু ফল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। স্থানীয়ভাবে এটি হাসাউড়ার আনারস নামে পরিচিত হলেও এর আসল জাত হানিকুইন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সঠিক সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই আনারস দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। এর মৌসুমের শুরু মে মাস থেকে। যখন বাগানে ফল সংগ্রহ শুরু হলেও জুন মাসের এই ভরা বর্ষায় হাসাউড়ার টিলাগুলো পাকা আনারসের গন্ধে ভরে ওঠে। এ সময় ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে মুখর সীমান্তবর্তী এই জনপদ। সম্পূর্ণ রাসায়নিকমুক্ত এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে উৎপাদিত এই আনারসে আঁশের পরিমাণ কম, রস বেশি এবং স্বাদে মধুর মতো মিষ্টি।
এই অঞ্চলের বাগান মালিকদের একজন নিতাই চন্দ্র দাস। তিনি জানান, বাজারে হাসাউড়ার আনারসের নাম শুনলেই ক্রেতা আগ্রহ নিয়ে কিনতে আসেন। গাছে পুরোপুরি পেকে যাওয়ার পর ফল সংগ্রহ করা হয়, তাই এর স্বাদ ও মান অক্ষুণ্ণ থাকে। চলতি মৌসুমে বাগান থেকে প্রায় ৫ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করেছেন তিনি।
আরেক চাষি ইসলাম উদ্দিন বলেন, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে অন্য জেলার আনারসকে হাসাউড়ার আনারস বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এটি নতুন ফল নয়। বরং এই অঞ্চলের ঐতিহ্য। এই আনারসের স্বাদ এতটাই আলাদা যে, ক্রেতারা মুখে দিলেই আসল-নকল ধরে ফেলতে পারেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের মতে, কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ফল সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এই আনারসের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, বর্তমানে হাসাউড়া এলাকায় প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে ‘হানিকুইন’ জাতের আনারসের চাষ হয়েছে। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, এই জাতের আনারস অত্যন্ত সুমিষ্ট ও সুস্বাদু হওয়ায় সারাদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন করা গেলে ভবিষ্যতে বিদেশেও এই আনারস রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেন, যোগদান করার পর এই প্রথম এই আনারসের মৌসুম পেয়েছি। হাসাউড়ার আনারস খাওয়ার পর মনে হয়েছে, এর আগে এত সুস্বাদু আনারস খাইনি। এই ফলকে জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বলেন, হাসাউড়ার আনারসকে দেশের ঐতিহ্যবাহী জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- ফল