লক্ষীপুরে স্কুলছাত্র হত্যা
‘আমাদের ভাইকে কে নিয়ে গেল?’
মেহেদী হাসান
আতোয়ার রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ২২:২৫ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ২২:২৬
ছোট দুই বোন মানহা (৮) ও মেহেরুন (১০) এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না, তাদের ভাই মেহেদী হাসান (১৪) আর কখনও ফিরবে না। ভাইয়ের ছবি বুকে জড়িয়ে তাদের একটাই প্রশ্ন– আমাদের ভাইকে কে নিয়ে গেল?
বৃহস্পতিবার সকালে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়নের রাঘবপুর গ্রামে মেহেদীর বাড়িতে এই হৃদয়বিদারক প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় সংবাদকর্মীদের। এই গ্রামের জিয়াউদ্দিন জিয়া-শারমীন আক্তার দম্পতির ছেলে মেহেদী। গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির আবাসিক কক্ষে পাওয়া যায় তার ঝুলন্ত মরদেহ। স্বজনের অভিযোগ, আইফোন চুরির অপবাদ দিয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী এই কিশোরকে নির্যাতন করে। পরে তার মৃত্যু হলে ঘটনা অন্যদিকে নিতে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়।
ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমিতে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত মেহেদী। বয়স মাত্র ১৪ বছর। তার চোখভরা স্বপ্ন ছিল বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে, উচ্চশিক্ষা অর্জন করে পরিবারকে সুখে রাখবে। কিন্তু সেই মেহেদীর নিথর দেহ বাড়িতে আনা হয় বুধবার রাতে। জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে এই কিশোরকে। তার ফুফু তানিমা সুলতানা বলেন, ‘একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল মেহেদী। সেই স্বপ্নকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা দ্রুত বিচার চাই।’
গতকাল বাড়িতে দেখা যায়, পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ। ঘরের এক কোণে পড়ে আছে মেহেদীর স্কুলব্যাগ, বই-খাতা আর ব্যবহৃত পোশাক। এসবের দিকে তাকালেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা শারমীন আক্তার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা খুব শান্ত ছিল। কখনও কারও ক্ষতি করেনি। তাকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছিলাম। আজ আমার বুক খালি হয়ে গেছে। যারা আমার সন্তানকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে, আমি তাদের বিচার চাই।’
গতকাল বুধবার বিকেল ৪টায় রামগঞ্জ থানায় এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ দেন মেহেদীর বাবা জিয়াউদ্দিন জিয়া। তিনি সমকালকে বলেন, ‘ছেলের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ছাত্রাবাসে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, ভালোভাবে লেখাপড়া করবে। কিন্তু আজ সেই ছেলেকে কবর দিতে হয়েছে। আমার সন্তান আর ফিরবে না। কিন্তু আমি হত্যাকারীদের বিচার চাই।’
বিক্ষোভ-প্রতিবাদ অব্যাহত
মেহেদীর মরদেহ উদ্ধারের পর মঙ্গলবার রাতেই ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া একাডেমির প্রধান ফটক ও অভ্যর্থনা কক্ষে ভাঙচুর চালায় এলাকার লোকজন। নোয়াখালীতে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে বুধবার দুপুরে রামগঞ্জ থানা ঘেরাও করেন স্বজন ও এলাকাবাসী। গতকাল দুপুর ২টার দিকে মেহেদী হত্যার বিচার চেয়ে রামগঞ্জ সরকারি কলেজ ফটক থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শিক্ষার্থীরা। তারা শহরের চৌরাস্তা এলাকায় মানববন্ধন করে। এ সময় লক্ষ্মীপুর-রামগঞ্জ-হাজীগঞ্জ ও রামগঞ্জ-চাটখিল সড়কে যানজট দেখা দেয়। পরে বিক্ষোভকারীরা দ্বিতীয় দফায় রামগঞ্জ থানা ঘেরাও করে।
লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার আবু তারেক বলেন, ‘মেহেদী হাসানের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। আমরা বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। পরিবারের দেওয়া অভিযোগ গুরুত্বসহকারে যাচাই করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ সব তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে। তদন্তে যারাই জড়িত বলে প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কোনো অপরাধীকেই ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
- বিষয় :
- লক্ষীপুর
- স্কুলছাত্র নিহত
