ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বর্ষার হাওরে বিদ্যার দুর্দশা, প্রাথমিকে ঝরে যাচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীরা

বর্ষার হাওরে বিদ্যার দুর্দশা, প্রাথমিকে ঝরে যাচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীরা
×

হাওরে জমা বানের পানি মাড়িয়ে যাচ্ছে তাহিরপুর উপজেলার শাহগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী সমকাল

আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬ | ০৯:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার হাওরপারের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বর্ষায় আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্লাবিত পথঘাট ও পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অভাবে প্রতিবছর, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে ঝরে যায় হাজারো শিশু। বর্ষা যাওয়ার আগে ওই শিশুর অনেকেই বিভিন্ন কাজে যোগ দেয়। এরপর তাদের আর বিদ্যালয়ে ফেরা হয় না।
ভরা বর্ষায় বন্যার পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতে হয় শিক্ষার্থীদের। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত পোশাক সঙ্গে রাখতে হয়। বিদ্যালয়ে এসে ভেজা কাপড় বদলে তারা ক্লাসে বসে। এ অঞ্চলের অনেক পরিবারের সে সামর্থ্য নেই।

বর্ষায় মাটির রাস্তাগুলো পানির নিচে তলিয়ে যায়। কাদা ও পিছল রাস্তায় অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। বই-খাতা সুরক্ষায় তাদের ব্যবহার করতে হয় পলিথিন।
উপজেলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট থাকায় শিক্ষার্থীদের দূরের পথ পাড়ি দিতে হয় নিজের নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানে যেতে। বিদ্যালয়হীন গ্রাম উপজেলায় মোট ২৪৯টি। এর মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ১৩৪টি গ্রামে। বাকি ১১৫টি গ্রামে কোনো বিদ্যালয় নেই।

দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি শ্রীপুর দক্ষিণ, শ্রীপুর উত্তর এবং দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের মতো হাওরবেষ্টিত অঞ্চলে বছরের প্রায় ছয় মাস এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়ার পথ বন্ধ থাকে। ফলে এ দীর্ঘ সময়ে শিশুরা বিদ্যালয়বিমুখ হয়ে পড়ে এবং হেমন্তে মা-বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে জড়িয়ে যায়।
সম্প্রতি উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের মন্দিয়াতা নতুন হাটি, মুজরাই, পানিয়াখালি, বেতাগড়া, জামালপুর, দক্ষিণ শ্রীপুর ও দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়গামী বয়সের শিশুরা পড়াশোনা ছেড়ে দলবেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে বা খেলাধুলা করছে।

দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের অভিভাবক হাদিসনূর জানান, নিজ গ্রামে স্কুল নেই। অন্য গ্রামের স্কুলে পাঠানোর মতো যোগাযোগ ব্যবস্থাও বর্ষায় থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে শিশুদের ঘরে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।
শাহগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুবাশ্বির আলম জানান, যোগাযোগের সমস্যার কারণে বর্ষায় উপস্থিতি অনেক কমে যায়। শাহগঞ্জ গ্রামের প্রায় ২০০ মিটার রাস্তা বর্ষার শুরুতেই তলিয়ে যায়। শিশুরা হাঁটুপানি পার হয়ে দুই পোশাকে বিদ্যালয়ে আসে।
একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানায় ওই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী পলি সরকার ও চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র লাবিবুল ইসলাম। লাবিবুল বলে, পানির নিচে মাটির রাস্তা হওয়ায় প্রায়ই পিছলে পড়ে যায় অনেকেই। তাই বই আর বাড়তি পোশাক পলিথিনে ভরে নিয়ে আসতে হয়।

হাওরাঞ্চলে কর্মরত উন্নয়ন সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স সার্ভিস (সিএনআরএস)-এর তাহিরপুর উপজেলা সমন্বয়কারী ইয়াহিয়া সাজ্জাদ জানান, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। অনুমোদন পেলে শিক্ষার্থীদের জন্য নৌকা তৈরি করে দেওয়া হবে। এর আগে ২০২২ সালেও তারা দুটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা সরবরাহ করে সুফল পেয়েছিলেন।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, বিদ্যালয়ের স্লিপের বরাদ্দ থেকে নৌকা তৈরি করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গ্রামের শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার জন্য প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দূর করতে প্রতিটি গ্রামে একটি করে বিদ্যালয় স্থাপন করা জরুরি। অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে নতুন বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে হাওরের সমস্যা কাটবে। এরইমধ্যে  উপজেলার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

×