আনোয়ারের ১২ হাজার ‘সন্তান’
এক যুগে লাগিয়েছেন ১২ হাজার গাছ
পথের পাশে নিজ হাতে লাগানো গাছের নিয়মিত পরিচর্যা করেন আনোয়ার হোসেন। সম্প্রতি কুড়িগ্রাম জেলা শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তোলা -সমকাল
সুজন মোহন্ত, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩০ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪১
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে পুড়ছে চারপাশ। মানুষ একটু সুশীতল ছায়ার খোঁজে ব্যাকুল। ঠিক এই সময়ে কুড়িগ্রাম শহরের পথচারীদের স্বস্তি দিচ্ছে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া, সোনালু আর জারুল গাছ। এই সবুজ শান্তির পেছনের কারিগর কোনো সরকারি সংস্থা নয়; স্কুলের দপ্তরি। তাঁর নাম আনোয়ার হোসেন।
১২ বছর ধরে কুড়িগ্রাম জেলা শহরকে পরম মমতায় সবুজে মুড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি। পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কর্মচারী আনোয়ার এক যুগে নিজ হাতে রোপণ করেছেন ১২ হাজারের বেশি গাছ।
সংসারে কোনো সন্তান নেই আনোয়ার-ফাতেমা দম্পতির। তাই এই গাছগুলোকেই নিজ সন্তানের মতো আগলে রেখেছেন তারা। ২০১৩ সালে নিজের এক ব্যাগ রক্ত দেওয়ার বিনিময়ে পাওয়া কয়েকটি চারা দিয়ে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। এরপর আর থামেননি। একসময় ডাস্টবিন বা ঝোপঝাড় থেকে চারা কুড়িয়ে এনে লাগাতেন। এখন নিজের বসতভিটাতেই চারা উৎপাদন করছেন। স্কুল ছুটির দিনগুলোতে নিজের টাকা খরচ করে গাছের গোড়ায় সার, পানি কিংবা বেড়া দেওয়ার কাজ আনোয়ার করেন এক হাতে। এ কাজে সহযোগিতা করছেন স্থানীয়রাও।
শহরের টাপুরচর এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারের স্বপ্ন পুরো জেলাকে সবুজে ভরিয়ে দেওয়া। তীব্র এই জলবায়ু সংকটের সময় একজন সাধারণ মানুষের এই প্রকৃতিপ্রেম কুড়িগ্রামের মানুষের কাছে এখন পরম গর্বের।
রক্তের বিনিময়ে যাত্রা শুরু
বৃক্ষপ্রেমী এই দপ্তরির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাছ রোপণ করা তাঁর এক ধরনের নেশা। ২০১৩ সালে নিজের রক্ত দান করার বিনিময়ে কয়েকটি গাছ চেয়ে নিয়েছিলেন তিনি। সেই গাছ বাড়িতে রোপণের পর থেকেই প্রকৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়। শুরুতে তিনি প্রতি সপ্তাহে দুটি, প্রতি মাসে ১০টি; এভাবে প্রতিবছর ১ হাজার বৃক্ষ রোপণের সংকল্প নেন।
সরেজমিন কুড়িগ্রামের চর হরিকেশ, বাসস্ট্যান্ড, ধরলা সেতু, বীরপ্রতীক তারামন বিবি সড়ক, পৌরবাজার, ডিসি পুকুর, জর্জকোর্ট চত্বর, ট্রাফিক অফিস, শাপলা চত্বর ঘুরে দেখা যায়, আনোয়ারের রোপণ করা গাছগুলোয় নানা প্রজাতির ফুল-ফল শোভা পাচ্ছে। শহরের পরিত্যক্ত ও অস্বাস্থ্যকর স্থানের সৌন্দর্য বর্ধনে তিনি গড়ে তুলেছেন ফুলের বাগান।
সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে শিক্ষার্থীরা
আনোয়ারের এই সবুজ বিপ্লবে এখন যুক্ত হয়েছে এক দল তরুণ শিক্ষার্থী। তাদের অধিকাংশই স্থানীয় ওরাকল লাইব্রেরির পাঠক। শিক্ষার্থীদের বই পড়া ও জানার পরিধি বাড়াতে এই গ্রন্থাগার নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন আনোয়ার। বর্তমানে তিনি তাঁর প্রতিবেশীর একটি পারিবারিক কবরস্থান পরিষ্কার রাখার শর্তে সেখানে পরম যত্নে দু-তিন হাজার কৃষ্ণচূড়া, বট, পাকুড়, জাম, জারুল, কাঠবাদাম, আম, বকুল, নিম ও অর্জুনের চারা উৎপাদন করছেন। পাশাপাশি তিনি তাঁর বসতভিটায় চার-পাঁচ হাজার চারা প্রস্তুত করেছেন। চলতি বছর এক হাজার চারা রোপণ এবং বাকিগুলো শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করবেন।
গাছের প্রতি ভালোবাসাতেই আনন্দ আনোয়ারের স্ত্রীর
আনোয়ারকে নিয়ে তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, বিয়ের ১০ বছরে তাঁর সংসারে তেমন মন না থাকলেও গাছের প্রতি আলাদা টান রয়েছে। অবসর পেলেই গাছকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন। আমাদের সন্তান না থাকায় আমার কোনো খারাপ লাগা নেই। তাঁর গাছের প্রতি ভালোবাসাই আমার আনন্দ।
টাপুরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা কল্পনা রানী সরকার বলেন, ‘আনোয়ার হোসেন দীর্ঘ ১৩-১৪ বছর ধরে আমার স্কুলে কর্মরত। তিনি কখনোই কাজে ফাঁকি দেননি। এমনকি ছুটিও নেননি। অবসরে তিনি এ ধরনের কল্যাণমূলক কাজ করেন, যা আমাদের সবার বুক গর্বে ভরিয়ে দেয়।’
চর হরিকেশ এলাকায় ঘুরতে আসা পথচারী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই তীব্র গরমে আমরা যখন একটু গাছের ছায়া খুঁজছি, তখন আনোয়ার ভাই নিজ খরচে আমাদের পুরো জেলাকে সবুজ করে গড়ে তুলছেন। জেলার বাসিন্দা হিসেবে এটা আমাদের বড় গর্বের।’
পরিবেশ সুরক্ষায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত
আনোয়ার হোসেন তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলেন, ‘শহরের তারামন বিবি সড়কের আট কিলোমিটারে প্রায় ৫০০ চারা রোপণ করেছি; গাছে ফলও ধরেছে। হলোখানা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পৌরসভার প্রায় ছয় কিলোমিটারে ফল ও ফুলের গাছ লাগিয়েছি। যখন দেখি পাখি এসে ফল খাচ্ছে, লোকজন গাছের নিচে বসে জিরোচ্ছে, তখন মন ভালো হয়ে যায়। আমি পুরো জেলাকে গাছে গাছে ভরিয়ে দিতে চাই।’
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও উদ্ভিদবিদ মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আনোয়ার সবার কাছে প্রেরণার উৎস। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিম্ন পদে চাকরি করা এই যুবকের প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা সত্যিই অনুকরণীয়। তাঁকে দেখে নতুন প্রজন্ম উজ্জীবিত হলে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতি সুরক্ষিত হবে।’
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১২ হাজারের অধিক গাছ রোপণ করা এক অসামান্য কীর্তি। সরকারিভাবে তাঁকে কোনো সহযোগিতা করা যায় কিনা, বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।
