পাটের গৌরব ফেরাতে জিআই স্বীকৃতিকে কাজে লাগানোর আহ্বান
পাটের বৈশ্বিক সম্ভাবনা শীর্ষক কর্মশালা
ফরিদপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ২১:৩৬
ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী পাটের আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং মানসম্পন্ন পাট উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছেন কৃষিবিজ্ঞানী ও গবেষকরা।
শুক্রবার ফরিদপুরের ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) আয়োজিত ‘ফরিদপুরের পাটের জিআই স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক সম্ভাবনা’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব বিষয় উঠে আসে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. রাশিদা ফেরদৌস প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিজেআরআইর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এস এম মাহবুব আলী।
জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলামের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন, কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান আবদুছ ছালাম, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম, পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নার্গিস আক্তার ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ফরিদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. খায়ের উদ্দিন মোল্লা।
বক্তারা বলেন, দেশের ৬০তম জিআই পণ্য হিসেবে ফরিদপুরের পাটের স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব। তবে এজন্য উন্নত বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
কর্মশালায় ‘সবুজ সোনা’ নামে পরিচিত বিজেআরআই তোষা পাট-৯ জাতের বীজ সংকটকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বক্তাদের মতে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এই জাতের চাষে উৎসাহ দিলেও বিএডিসি এখনও মূলত জিআরও-৫২৪ জাতের বীজ সরবরাহ করছে। এ সমন্বয়হীনতা দূর না হলে উন্নত জাতটি মাঠে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।
ফরিদপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, সবুজ সোনা জাতটি জিআরও-৫২৪-এর তুলনায় বেশি খরাসহিষ্ণু হলেও পর্যাপ্ত বীজের অভাবে কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক শাহাদুজ্জামান বলেন, সবুজ সোনা জাতের বীজ উৎপাদন হয় রবি মৌসুমে। কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে বীজ উৎপাদনে উৎসাহিত না করলে কয়েক বছরের মধ্যে এ জাত হারিয়ে যেতে পারে।
সবুজ সোনা জাতের অন্যতম উদ্ভাবক বিজ্ঞানী ড. মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, এ জাত ৯০-১০০ দিনে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩ টন এবং ১২০ দিনে সাড়ে ৩ টন পর্যন্ত ফলন দেয়। এর বিস্তারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বিএডিসি ও বিজেআরআইর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পাট উদ্যোক্তা এস এম গোল্ডেন গ্রিটের মাশফিকা জামান বলেন, জিআই স্বীকৃতির পাশাপাশি রপ্তানি বাড়াতে মানসম্পন্ন পাট উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য প্রবহমান পানিতে পাট জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা জরুরি।
বিজেআরআইর মহাপরিচালক ড. নার্গিস আক্তার বলেন, পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের বিশ্ববাজার ক্রমেই সম্প্রসারিত হচ্ছে। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়াতে সরকার কাজ করছে। তবে উন্নত বীজ সরবরাহে সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করতে হবে।
প্রধান অতিথি ড. রাশিদা ফেরদৌস বলেন, ফরিদপুর জিআই স্বীকৃতি পাওয়ায় এ অঞ্চলের দায়িত্বও বেড়েছে। এখান থেকেই মানসম্পন্ন পাটবীজ উৎপাদনে স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ফরিদপুরের পাট আবারও দেশের অর্থনীতিতে ‘সোনালি আঁশ’-এর গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারে।