ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

জয়পুরহাটের কালাই

খাল খননে গভীরতা-প্রস্থে গরমিল, বৃক্ষরোপণেও অনিয়ম

খাল খননে গভীরতা-প্রস্থে গরমিল, বৃক্ষরোপণেও  অনিয়ম
×

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় সম্প্রতি খনন করা একটি খাল সমকাল

শাহারুল আলম, জয়পুরহাট

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া বাইগুনি খাল পুনর্খনন প্রকল্পে ৫২ লাখ টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও বাস্তবে শিডিউল অনুযায়ী কাজ না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। খালের অধিকাংশ অংশ নির্ধারিত গভীরতা ও প্রস্থে খনন না করেই কাজ শেষ দেখানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রকল্পের শ্রমিক তালিকায় প্রকৃত দরিদ্র শ্রমিকদের বাদ দিয়ে প্রকল্প সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেনের স্বজন এবং বিত্তবান ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সরকারি অর্থ উত্তোলনেরও অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে কৃষিজমি জলাবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
আমজাদ হোসেনের ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমি ওই কাজ দেখভাল করি। তবে শ্রমিকের তালিকায় কীভাবে নাম উঠলো তা আমার জানা নেই।’

কালাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া বাইগুনি এলাকায় দুই হাজার ১০০ মিটার দীর্ঘ খাল পুনর্খননে চলতি বছরের ১৩ মে কাজ শুরু হয়। ২৯ জুন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী খালের ওপরের প্রস্থ ২০ ফুট (গ্রামের ভেতরের কিছু অংশে ১৫ ফুট), তলদেশের প্রস্থ আট ফুট এবং গভীরতা পাঁচ ফুট হওয়ার কথা।
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের শুরুতে অল্প কিছু অংশ ছাড়া অধিকাংশ জায়গায় নির্ধারিত প্রস্থ ও গভীরতা বজায় রাখা হয়নি। কোথাও ওপরের প্রস্থ ১৫ ফুট, কোথাও ১৯ ফুট হলেও গড়ে তা সাড়ে ১৫ ফুটের বেশি নয়। তলদেশের প্রস্থও অধিকাংশ স্থানে ছয় ফুটের নিচে। প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় খননের কোনো সুস্পষ্ট চিহ্নই পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ অংশজুড়ে কচুরিপানা অপসারণ না করায় পানি চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা দেখা গেছে।

এ ছাড়া প্রকল্পে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণের কথা থাকলেও সেখানে নামমাত্র কয়েকটি চারা রোপণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এতে সর্বোচ্চ দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার কাজ হয়েছে। প্রকল্পে ১২৫ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কথা থাকলেও বাস্তবে ৫০ থেকে ৫৫ জনের বেশি কাজ করেননি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, শ্রমিক তালিকায় প্রকৃত দরিদ্র শ্রমিকদের পরিবর্তে প্রকল্প সভাপতির ছেলে সাজ্জাদুর রহমান (৮৩ নম্বর), ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম (৫৫ নম্বর) ছাড়াও চাচাত ভাই, ভাতিজা, ভাগিনা মিলে কমপক্ষে ২৫/২৭ জন বিত্তবান ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক বলেন, ‘তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তাদের অনেকেই মাঠে কাজই করেননি। অনেকের ১০ থেকে ২০ বিঘা জমি রয়েছে। তাদের নাম ব্যবহার করে সরকারি অর্থ তোলার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রকৃত শ্রমিকরা কাজ ও মজুরি দুটো থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন।’
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও তালোড়া বাইগুনি গ্রামের বাসিন্দা ছুমির জালাল বলেন, ‘খননের আগে খালটি এর চেয়ে ভালো ছিল। এখন যেভাবে কাজ হয়েছে, তাতে কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। অনিয়মের বিষয়ে অনেকেই মুখ খুলতে ভয় পান।’

বাইগুনী গ্রামের আব্দুল জলিল জানান, নকশা না মেনে কাজ করায় বর্ষায় খালটি আগের অবস্থায় ফিরবে। এটি উন্নয়নের নামে বড় ধরনের পুকুরচুরি ছাড়া কিছুই না।
অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেন বলেন, ‘শিডিউলের চেয়েও বেশি কাজ করেছি। কোথাও ২০ ফুটের বেশি প্রস্থ, ৯ ফুট তলদেশ এবং ৭ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত গভীরতা হয়েছে। কৃষকের স্বার্থেই অতিরিক্ত কাজ করা হয়েছে।’ শ্রমিক তালিকায় স্বজনদের নাম থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। 
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাসিবুল ইসলাম বলেন, ‘কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সরেজমিনে পরিমাপ করে যতটুকু কাজ পাওয়া যাবে, সে অনুযায়ীই বিল দেওয়া হবে। শ্রমিক তালিকা নিয়ে অভিযোগও তদন্ত করা হবে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. হারুনুর রশিদ জানান, পানি নিষ্কাশন না হলে খাল খনন অর্থহীন। এতে আগামী বর্ষায় ফসলের আরও বড় ক্ষতি হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা জানান, পরিদর্শনে নকশাবহির্ভূত কাজের বিষয়টি নজরে এসেছে। দ্রুত ত্রুটিপূর্ণ জায়গায় পুনরায় কাজ করতে হবে। এরপর অনিয়মের সতত্যা পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×