ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

ভারী বৃষ্টি ও ঢল

এবার ডুবল কুমিল্লা, কিছু জেলায় বন্যার শঙ্কা

এবার ডুবল কুমিল্লা, কিছু জেলায় বন্যার শঙ্কা
×

টানা বৃষ্টিতে গতকাল সোমবার কুমিল্লা নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি তলিয়ে যায়। পানি ওঠে সদর হাসপাতালের নিচতলাতেও। দুর্ভোগে পড়েন রোগী ও স্বজনেরা সমকাল

 সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

এবার ভারী বৃষ্টিতে ডুবল কুমিল্লা নগরী। গতকাল সোমবার তিন ঘণ্টায় ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নগরীর অধিকাংশ সড়ক, অলিগলি ও আবাসিক এলাকা ডুবে যায়। এদিকে উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে  দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদনদীর পানি বাড়ছে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রামে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

কুমিল্লায় অবর্ণনীয় দুর্ভোগ
কুমিল্লা নগরে জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল বেশি ভোগান্তিতে পড়েন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। যানবাহন না পেয়ে অনেক পরীক্ষার্থী ও পরীক্ষক সময়মতো কেন্দ্র প্রবেশ করতে পারেননি। সাধারণ মানুষকে দিরভর চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়।  
সকালে কুমিল্লা জেনারেল (সদর) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের মেঝেতে পানি। জরুরি বিভাগ ও রোগীদের শয্যার নিচেও পানি। একই চিত্র ছিল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এর আশপাশের এলাকায়। কুমিল্লা সিভিল সার্জন আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, হাসপাতাল চত্বর ডুবে যাওয়ায় বিকেল পর্যন্ত বিকল্প উপায়ে জরুরি বিভাগ চালু রাখা হয়। 
নগরীর মনোহরপুর, মহিলা কলেজ রোড, বাগান বাড়ি, দক্ষিণ চর্থা, জিলা স্কুল সড়ক, পুলিশ লাইন্স, রেসকোর্স, উত্তর রেসকোর্স, ঠাকুরপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, গোবিন্দপুর, মুরাদপুর এবং শহরতলির

ছায়াবিতান এলাকায় রাস্তাঘাট তলিয়ে বাড়ি বাড়ি 
পানি ঢুকে যায়। নগরীর জিলা স্কুল সড়ক ও মনোহরপুর সদর হাসপাতাল সড়কের সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যায়। 
নগরীর টমছম এলাকার দোলন মিয়া বলেন, নগরীর দক্ষিণে পানি প্রবাহের কান্দি খাল বিভিন্নভাবে ভরাট হয়ে গেছে। তাই ভয়ংকর জলাবদ্ধতা হচ্ছে। 
রাত ৮টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নগরীর অধিকাংশ এলাকা জলাবদ্ধ ছিল। 
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের প্রতিটি কর্মী মাঠে কাজ করছেন। 

নদনদীতে পানি বাড়ছে
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর চারটি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ ছাড়া নেত্রকোনার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। একই সঙ্গে সুরমা নদীর কানাইঘাট, সিলেট সদর ও সুনামগঞ্জ, তিস্তা নদীর ডালিয়া ও কাউনিয়া এবং মুহুরী নদীর হরিপুর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
পূর্বাভাস কেন্দ্র জানায়, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর, ময়মনসিংহ, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি অথবা বিদ্যমান পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। 

বিভিন্ন জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা
বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনায় পানি বাড়তে শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, যমুনার প্রবল স্রোতে বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগ জানায়, বেশ কিছু নিচু এলাকায় পাট, আউশ, শাকসবজি ও রোপা আমনের বীজতলায় পানি উঠে গেছে। বাঙালি নদীতেও পানি বাড়ছে। 
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেসুর রহমান জানান, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সদর, চৌহালী ও শাহজাদপুরের কিছু কিছু জায়গায় যমুনার তীরবর্তী অঞ্চলে ভাঙন বেড়েছে। 
উজানে ভারতের আসাম ও অরুণাচল প্রদেশে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে রোববার রাত থেকে তিস্তা নদীর পানি বাড়ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় লালমনিরহাটের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। 

হবিগঞ্জে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে মানুষ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেছে। তবে রাস্তাঘাট ও ঘরবাড়িতে কাদা থাকায় অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিন দেখা গেছে, ফসলি জমির ধানের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। সবজি ক্ষেতের চারাগুলো এলোমেলো পড়ে আছে। 
ক্ষতিগ্রস্ত রহিম মিয়া বলেন, ‘আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। ধানের জমি ও সবজি ক্ষেতের কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ 
জেলা প্রশাসক জি এম সরফরাজ বলেন, ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। 
সুনামগঞ্জে পাহাড়ি ঢল ও কয়েক দিনের বৃষ্টিতে বিভিন্ন জায়গায় কাঁচা-পাকা সড়ক ভেঙে গেছে। তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের শক্তিয়ার খলা, দুর্গাপুর ও আনোয়ারপুরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এতে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। 
তাহিরপুরে আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ওঠায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুলেমান মিয়া। 
ছাতক উপজেলার কিছু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার গ্রামীণ অধিকাংশ ছোট সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুরমা, চেলা ও পিয়াইন নদীতে পানি বৃদ্ধির কারণে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ইসলামপুর, জাউয়াবাজার, চরমহল্লা, উত্তর খুরমা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের মানুষ দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। এসব ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। 
পৌরসভার বাগবাড়ী, মণ্ডলীভোগ, ভাজনামহল, কুমনা লেবারপাড়া, তাঁতিকোনা, চরেরবন্দ, মঙ্গলপাড়া, বৌলাসহ কয়েকটি এলাকার অলিগলিতে পানি ঢুকে পড়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। 
ইউএনও মো. মহি উদ্দিন জানান, বন্যা ও দুর্যোগ মোকাবিলার স্থানীয় বিদ্যালয় ও পাকা ভবনগুলো পরিষ্কার করে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। 
নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিরিশিরি ইউনিয়নের খালিশাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন সোমেশ্বরী নদীর বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, নদীর পানি আরও বাড়লে খালিশাপাড়া, পিপুলনারী, ছামারদ্বাণী, বারইকান্দি, শিরবির, গুজিরকোনা, কুমুদগঞ্জসহ আশপাশের অনেক গ্রাম প্লাবিত হতে পারে। এতে শত শত হেক্টরের সবজি, বীজতলা, অসংখ্য বসতঘর, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং গবাদি পশুর ক্ষতি হতে পারে। 

জামালপুর পৌরসভার প্রধান সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি, সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি ওঠায় রান্নাবান্না বন্ধ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার সীমান্তবর্তী নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পানি দ্রুত বাড়ছে। মোগড়া, মনিয়ন্দ, দক্ষিণ ও ধরখার ইউনিয়নে পানি ঢুকেছে। সীমান্তবর্তী এলাকার অনেক বাড়িঘর 
তলিয়ে গেছে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্যুরো, আঞ্চলিক অফিস ও প্রতিনিধিরা]

আরও পড়ুন

×