ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

বন্যা ও ভারী বৃষ্টি

দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল, মাঠে কার্যকর প্রস্তুতি ছিল না

আশ্রয়কেন্দ্রের প্রস্তুতি ছিল সীমিত

দুর্যোগের পূর্বাভাস ছিল, মাঠে কার্যকর প্রস্তুতি ছিল না
×

কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রের প্রায় এক হাজার এইচএসসি শিক্ষার্থীকে গতকাল সোমবার হাঁটুপানি ভেঙে হলে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পরীক্ষা শেষেও পানি পেরিয়ে ফিরতে হয় -সমকাল

 জাহিদুর রহমান

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ধস হতে পারে– এমন সতর্কবার্তা গত ১ জুলাই থেকেই দেওয়া হচ্ছিল আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের বার্তা। এমনকি এল নিনোর প্রভাবে বড় বন্যার শঙ্কার কথাও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জানা। তবে সেই পূর্বাভাস সামনে রেখে মাঠ পর্যায়ে কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।

আগাম ত্রাণসামগ্রী মজুত, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা, চিকিৎসা দল সক্রিয় করা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রস্তুতি; কোনোটিই প্রয়োজনীয় মাত্রায় নেওয়া হয়েছে– এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে টানা অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও পাহাড়ধস কয়েক দিনের মধ্যেই মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের বন্যা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়; আগাম প্রস্তুতির ঘাটতি, সমন্বয়ের দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যর্থতা এবং উদ্ধার কার্যক্রমে বিলম্বের কারণেই ক্ষতির মাত্রা বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এমন আকস্মিক দুর্যোগ ভবিষ্যতে আরও ঘটতে পারে। তাই শুধু পূর্বাভাস নয়; সেই পূর্বাভাস কার্যকর প্রস্তুতিতে রূপান্তর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যে ভাষায় পূর্বাভাস দেয়; সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারে না। সতর্কবার্তাকে আরও সহজ করতে হবে। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৯ উপজেলা, ৩৩৪ ইউনিয়ন ও ১২ পৌর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১-তে। বন্যা, পাহাড়ধস ও সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪ জন; আহত ৩৯ জন।

সরকারি বিভিন্ন নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১ জুলাই এক মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসেই অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর ধারাবাহিকভাবে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। কক্সবাজার ও পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড় ধসের ঝুঁকির বিষয়ও উল্লেখ করা হয়। 
একই সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র নদনদীর পানি দ্রুত বাড়া এবং কয়েকটি পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রমের শঙ্কার তথ্য প্রকাশ করে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে মাঠ পর্যায়ে আগাম প্রস্তুতির দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কতটা বৃষ্টি হবে বা কী পরিমাণ ঢল নামবে, তা শতভাগ নির্ভুলভাবে আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। তবে বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে– এমন তথ্য সরকারের কাছে ছিল। সেই ঝুঁকি বিবেচনায় প্রশাসন চাইলে কার্যকর প্রস্তুতি নিতে পারত। 

ক্ষতিগ্রস্ত জেলার বাসিন্দা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও মানুষকে সেখানে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। কোথাও কোথাও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতই হয়নি। সরকারি নির্দেশে মেডিকেল টিম গঠন হলেও অনেক জেলায় তা সময়মতো মাঠে নামেনি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য, ওষুধের সংকটে ভুগছেন দুর্গত মানুষ। দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমও বিলম্বিত হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণেও আগাম প্রস্তুতির ঘাটতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বন্যা পরিস্থিতির শুরু হয় ৫ জুলাই। ওই দিনই পাহাড়ধসে ১০ জনের মৃত্যু হয়। তবে সাত জেলার জন্য প্রথম দফায় ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয় ১২ জুলাই। প্রথম ধাপে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও ৩ হাজার ২৫০ টন চাল। পরে দেশের অন্য ৫৭ জেলার জন্য অতিরিক্ত ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ও ৫ হাজার ৭০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার আগেই একের পর এক এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিপুলসংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও পুনর্বাসনে প্রয়োজনের তুলনায় বর্তমান বরাদ্দ সীমিত। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা আরও বাড়াতে হবে। সেনাবাহিনী, বিজিবির পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় নৌ ও বিমানবাহিনীর সহায়তা নিতে হবে।

এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় জনবল সংকটের কারণে বন্যা মোকাবিলা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। 

তবে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুন আখতার বলেন, বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পর জনবলসহ সামগ্রিক কাঠামো পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে বাড়িঘর প্লাবিত হলেও অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি। ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের সরাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কক্সবাজারে পাহাড়ধসে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। 
দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও সমন্বিত পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে সড়ক ও রেলপথ তলিয়ে যাওয়ায় দুর্গত এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় দুর্ভোগ ও ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, ১ জুলাই থেকেই ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। কোথায় ভারী বৃষ্টি হবে এবং কোথায় পাহাড় ধসের শঙ্কা রয়েছে, সেটিও জানানো হয়েছিল। আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ভারী বর্ষণের সতর্কবার্তা যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর, ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে। 
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, আকস্মিক বন্যা এখন বৈশ্বিক বাস্তবতা। এ ধরনের বন্যায় অনিশ্চয়তা থাকে। তার পরও কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পূর্বাভাস প্রচার করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সেই তথ্য পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান দাবি করেন, বন্যা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল এবং সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, জেলা প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, মানুষকে আগেভাগে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে রাজি হননি।
কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, আগামী এক সপ্তাহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নদীর পানির তথ্য প্রতি ঘণ্টায় হালনাগাদ করা এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের জেলা পর্যায়ের আবহাওয়া স্টেশনগুলোর বৃষ্টির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। নদীর পানির উচ্চতা দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। সময়োপযোগী তথ্য স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন, উদ্ধারকারী সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে। 

নতুন করে ৯ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস
উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্তত ৯ জেলার নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। পাশাপাশি বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।  গতকাল সোমবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তি এবং পাউবোর নিয়মিত বন্যা পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানানো হয়।

অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। 

 

আরও পড়ুন

×