শিক্ষার্থীরা ভাঙল রাতের নীরবতা
সমকাল প্রতিবেদক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৫ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের প্রথম দিনে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা ১৩ দিন শিক্ষার্থীদেরই ছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ আখ্যা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ১৪ জুলাই রাতে আবাসিক হল ছেড়ে নেমে আসেন রাজপথে। ছাত্রীরাও হলের গেট ভেঙে বেরিয়ে আসেন। মধ্যরাতের নীরবতা ভেঙে শিক্ষার্থীদের তপ্ত স্লোগান আন্দোলনকে নিয়ে যায় অভ্যুত্থানের দিকে।
শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়; জগন্নাথ, বুয়েট, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, শাহজালাল, ইসলামী, কুমিল্লা, বেগম রোকেয়া, বরিশাল, যশোরসহ অন্তত ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেই রাতে ছাত্রলীগের দমনের ভয়কে উপেক্ষা করে রাজপথে নামেন। সামাজিক মাধ্যমে সেই রাতেই প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের দাবিতে সমর্থন জানাতে শুরু করে।
চব্বিশের ৬ জুন হাইকোর্ট সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান-নাতিদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল করেন। শিক্ষার্থীরা তা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সেদিন থেকে বিক্ষিপ্ত আন্দোলন শুরু করেন। তারা তৎকালীন সরকারকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন।
দাবি পূরণ না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামে সংগঠন গড়ে রাজপথে নামেন। ৬ জুলাই পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি ছিল ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক। ৪ জুলাই তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি মুলতবি বা ‘নট টুডে’ বলে আদেশ দেন। এতে শিক্ষার্থীরা ৭ জুলাই থেকে ক্যাম্পাসের বাইরেও সড়ক অবরোধ করতে শুরু করেন। ১০ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় এক মাসের জন্য স্থগিত করেন।
দেশে ফিরে ক্ষুব্ধ শেখ হাসিনা
চব্বিশের ৮ জুলাই চার দিনের সফরে চীন গিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। ১১ জুলাই ফেরার কথা ছিল তাঁর। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে ১০ জুলাই রাতে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এরপর ১৪ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতিকে স্মারকলিপি দিতে বঙ্গভবনে যান। এ দিন বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জমায়েত হন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। সদরঘাট থেকে মিছিল নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। দুপুর ১২টায় পদযাত্রা নিয়ে বঙ্গভবন অভিমুখে ভিসি চত্বর, রাজু ভাস্কর্য, শাহবাগ দিয়ে তারা রওনা হন।
এক পর্যায়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ও সচিবালয় হয়ে জিপিওর সামনে গেলে পুলিশ ব্যারিকেড তৈরি করে বাধা দেয়। এরপর তারা বাধা ভেঙে পাতাল মার্কেট সংলগ্ন গুলিস্তান মোড়ে অবস্থান নেন এবং ১২ জনের একটি দল নিয়ে বঙ্গভবনে গিয়ে স্মারকলিপি দেন।
সেদিন বিকেল ৩টায় গণভবনে ছিল শেখ হাসিনার চীন সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন। কর্মসূচি শেষ করে শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে দেখতে পান শেখ হাসিনা তাদের ইঙ্গিত করে বলছেন, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরা কোটা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিরা কোটা পাবে? তা তো আমরা দিতে পারি না।’
গুমোট সন্ধ্যার পর উত্তাল রাত
শেখ হাসিনার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া প্রথমে আসে সামাজিক মাধ্যমে। ফেসবুকে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রাত নামার পর প্রতিটি হলের বারান্দা-জানালায় দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা, ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার’, ‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’ দুয়োধ্বনি দেয়। এর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানোর পর আওয়ামী লীগ সমর্থকরা সমালোচনা শুরু করেন। শিক্ষার্থীদের দমনে ডাক আসতে থাকে।
রাত ১১টার দিকে শামসুননাহার হলের ছাত্রীরা হল গেটের তালা ভেঙে মিছিল নিয়ে বের হন। এরপর রোকেয়া হলের ছাত্রীরা মিছিল নিয়ে বের হন। স্লোগানে স্লোগানে তারা মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এরপর বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা হল, কুয়েত-মৈত্রী হল, সুফিয়া কামাল হলের মেয়েরাও বেরিয়ে আসেন। ছেলেদের হলগুলো থেকেও বের হয়ে আসেন শিক্ষার্থীরা।
এ সময় খবর পেয়ে হল গেটে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে হল ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীরা। তবে শিক্ষার্থীদের আটকাতে পারেননি ছাত্রলীগের নেতারা। জানা যায়, বিজয় একাত্তর হল, মাস্টার দা সূর্য সেন হল, এফ রহমান হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলসহ বিভিন্ন হলে বাধা দেওয়া হয়। সেদিন ছাত্রলীগের চার পদধারী নেতা ঘোষণা দিয়ে পদত্যাগও করেন।
সেই রাতের স্মৃতি
কুয়েত-মৈত্রী হলের ছাত্রী রাফিয়া রেহনুমা হৃদি সমকালকে বলেন, ‘ওই দিন যৌক্তিক দাবিকে যেভাবে তৎকালীন সরকার ট্যাগিং করেছে এবং স্বৈরাচারের যে হাতিয়ার থাকে– মুক্তিযুদ্ধ কার্ড খেলা, সেটির শিকার হয়েছিল শিক্ষার্থীরা। তখন সব হলেই প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এ ছাড়া ছাত্রলীগের বাধা মেয়েদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। আমরা হলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিই। তখন এমন আন্দোলনে হল গেট খোলা হতো না, কিন্তু আমরা তালা ভেঙে রাজু ভাস্কর্যে জড়ো হই।’
হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ছাত্র এম এ সাঈদ বলেন, “স্লোগানে আমরা ‘রাজাকার’ শব্দটাকে বিদ্রুপ করে ব্যবহার করেছি। প্রতিটি হলে স্লোগান দেওয়া হচ্ছিল। বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বাধা দেয়। আমরা তখন মিছিল নিয়ে একাত্তর হলে যাই, সেখানে ছাত্রলীগ আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ওপর হামলা করে। তবে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে মিছিলে যোগ দেন। ছাত্রীরা তালা ভেঙে বের হন, অন্যদিকে হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সারজিস আলম বিজ্ঞানের হলগুলো থেকে মিছিল নিয়ে আসেন।”
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ১৪ জুলাই রাতে শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসা ছিল ক্ষোভের বিস্ফোরণ। শেখ হাসিনার ক্ষমতার দম্ভে অপমানিত শিক্ষার্থীরা আর চুপ থাকতে পারছিল না। ছাত্রলীগের ভয় ভেঙে সেই রাতের নীরবতা ভাঙা ছিল অভ্যুত্থানের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।
কবি সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা সমকালকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মতো ব্যক্তির কাছ থেকে ট্যাগিংয়ে সেদিন ছাত্রীরা মন খারাপ করে বেরিয়ে এসেছিল। তবে শিক্ষার্থীদের চাকরির সমস্যাগুলো এখনও রয়ে গেছে, জটিলতা দূর হয়নি। আমরা প্রকৃত সমস্যা থেকে অনেক বেশি বয়ানে জড়িয়ে গেছি।’
- বিষয় :
- জুলাই আন্দোলন
- কোটা সংস্কার আন্দোলন