পাইপ বসেছে ৩৩ কিলোমিটার, পানি মেলেনি এক ফোঁটাও
পানির পাম্প
মোন্নাফ আলী, উলিপুর (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৯ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
চারটি আধুনিক পানির পাম্প। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, প্রতিদিন হাজারো মানুষের ঘরে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দিচ্ছে। বাস্তবে চিত্রটি ঠিক উল্টো। বছরের পর বছর তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ভেতরের যন্ত্রপাতিতে ধুলার স্তর, পাইপে মরিচা আর চারপাশজুড়ে আগাছা। এ চিত্র কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পৌর শহরের প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পানি সরবরাহ প্রকল্পে। পাঁচ বছর ধরে প্রকল্পটি অচল পড়ে থাকলেও এক ফোঁটা পানিও পাননি আবেদনকারী গ্রাহকরা। ফলে এর কার্যকারিতা ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
পৌরবাসীর নিরাপদ সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বাংলাদেশের ২৩টি পৌরসভার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি)-এর অর্থায়নে উলিপুরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি গভীর নলকূপ ও পাম্প হাউস নির্মাণ এবং প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৩ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে ২ হাজার ৬৫০টি পরিবারকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
২০২২ সালে কুড়িগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আদিল ইন্টারপ্রাইজ প্রকল্পের কাজ শুরু করে এবং ২০২৩ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও সেটি চালু হয়নি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দাবি, নিম্নমানের কাজ ও বিভিন্ন ত্রুটির কারণে পরীক্ষামূলকভাবে পাম্প চালু করলেই পাইপলাইনে একাধিক স্থানে লিকেজ দেখা দেয়। ফলে ত্রুটি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পটি বুঝে নিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দাবি করছে, অধিকাংশ ত্রুটি ইতোমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে।
এদিকে প্রায় ৭০০ গ্রাহকের বাড়িতে সংযোগ লাইন দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত তারা এক ফোঁটা পানিও পাননি। এতে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। পাম্প হাউসগুলো ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের বিভিন্ন স্থানে অবহেলার চিহ্ন স্পষ্ট। যন্ত্রপাতিতে মরিচা ধরেছে, কক্ষজুড়ে ধুলাবালি জমেছে। কোথাও কোথাও আগাছায় ঢেকে গেছে প্রকল্প এলাকা। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরু থেকেই নিম্নমানের কাজ ও তদারকির অভাবে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে।
পৌরসভার নারিকেলবাড়ী খামার এলাকার বাসিন্দা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘এত বড় প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলো। তবুও মানুষ এক ফোঁটা পানিও পেল না। বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’
জোদ্দারপাড়া এলাকার বাসিন্দা তপন কুমার রায় বলেন, ‘সংযোগ পাওয়ার আশায় ১০০ টাকা দিয়ে আবেদন করেছিলাম। চার বছর আগে বাড়িতে পাইপও এনে দিয়েছে। আজ পর্যন্ত এক ফোঁটা পানিও পাইনি।’ একই অভিযোগ করেন তন্ময় সরকার, আশরাফুল আলম, বিপ্লব সরকার, শফিকুল ইসলাম ও আবুল কালাম মণ্ডল। তাদের ভাষ্য, ‘সেবার নামে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।’
উলিপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম বলেন, প্রকল্পে ব্যবহৃত পাইপের মান ভালো নয়। পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে বিভিন্ন স্থানে পাইপ ফেটে যাচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পে ওভারহেড পানির ট্যাঙ্ক না থাকায় এবং অধিকাংশ বাসাবাড়িতে আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভ ট্যাঙ্ক না থাকায় সরাসরি পানি সরবরাহও জটিল হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় প্রকল্পটি হস্তান্তর করা হলে পৌরসভার জন্য তা নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, ওভারহেড ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা হলে অনেক সমস্যা দূর হবে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে আবেদন করা হবে।
উলিপুর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, পাইপলাইনে বিভিন্ন ত্রুটি থাকায় প্রকল্পটি এখনও গ্রহণ করা হয়নি। ত্রুটিমুক্ত হওয়ার পরই গ্রহণ করা হবে। তবে প্রকল্পের মূল নকশায় ওভারহেড ট্যাঙ্ক ছিল না। সেটি যুক্ত করা হলে প্রকল্পটি কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সহজ হবে।
মেসার্স আদিল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘ত্রুটির অধিকাংশই সংশোধন করা হয়েছে। দ্রুত বাকি কাজ শেষ করে প্রকল্প হস্তান্তর করা হবে। নিম্নমানের কাজের অভিযোগ সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়রা বাড়িঘর নির্মাণের সময় পাইপলাইন কেটে ফেলায় নতুন করে সমস্যা তৈরি হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক এ টি এম আরিফ বলেন, ‘বিষয়টি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
যোগাযোগ করা হলে কুড়িগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশিদ প্রথমে পরে কথা বলার কথা জানালেও পরে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।