ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

টানা বর্ষণে ধান সবজি পান মাছের সর্বনাশ

টানা বর্ষণে ধান সবজি পান মাছের সর্বনাশ
×

প্রবল বর্ষণে ধসে যাওয়া পানের বরজ। গত রোববার পটুয়াখালীর বাউফল পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বিলবিলাস এলাকায় সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

টানা বর্ষণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন ফসল ও মাছচাষিরা। উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীতে রোপা বীজতলা ও আউশসহ গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ধসে পড়েছে পানের বরজ। নওগাঁর রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলায় তলিয়ে গেছে ৮০০ বিঘা জমির ফসল, ভেসে গেছে অর্ধকোটি টাকার মাছ।

আমনের বীজতলা ও আউশের ক্ষতি
পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা চরমোন্তাজ ইউনিয়নে বাড়ি কৃষক মোহাম্মদ আলী হোসেনের। তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে ইউনিয়নের সাতটি গ্রামের ফসলের মাঠ তলিয়ে গেছে। এতে রোপা আমনের বীজতলা, আউশ ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা। এ ছাড়া গ্রীষ্মকালীন শাকসবজিরও ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় চাষিরা দিশেহারা। 
একই উপজেলার চালিতাবুনিয়ার চাষি মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, বৃষ্টি, জোয়ারের পানি আর নদী সব একাকার। কোনটা নদী আর কোনটা ফসলের মাঠ তা বোঝার উপায় নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকরা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ খোঁজ নিচ্ছেন না। 
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্ষণে পটুয়াখালীর ২ হাজার ৬১৫ হেক্টর কৃষিজমির ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রোপা আমন বীজতলা আছে ৯৭০ হেক্টর, আউশ ধান আছে ৫২০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া ৪৫০ হেক্টর জমির শাকসবজি, ৫ হেক্টর জমির পাট, ১২০ হেক্টর জমির পেঁপে, ৮০ হেক্টর জমির কলা, ২৫ হেক্টর জমির পান, ৪০ হেক্টর জমির রকমেলন বা সাম্মাম, অর্ধ হেক্টর জমির মরিচ, ৪ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন তরমুজের ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে জেলার কৃষকের ৯০ লাখ থেকে এক কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা। 

বাউফলে পানের সর্বনাশ
জেলার বাউফল উপজেলার বিলবিলাস গ্রামের বেলায়েত খান, জাহাঙ্গীর হোসেন ও জাকির হোসেন বর্গা নেওয়া তিন একর জমিতে পানের চাষ করেছেন। এতে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। সময় লেগেছে চার মাস। জাহাঙ্গীর ও জাকির বললেন, ‘মোগো সংসার চলে পানের বরজ দিয়ে। বৃষ্টিতে তা শেষ কইরা দিছে।’ বেলায়েত বলেন, ঋণ নিয়ে দৈনিক ৮০০-৯০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়েছেন। পান ভালো হলে দামও পেতেন। কিন্তু বর্ষায় তাদের বরজ ধসে গেছে। ঋণ শোধ করবেন কি দিয়ে, আর নতুন বরজ করার টাকাই বা পাবেন কোথায়?
বিলবিলাস গ্রামের ইউপি সদস্য শাহ আলম বলেন, ২০২৪ সালের পর থেকেই পানচাষিদের দুরবস্থা। ওই বছর হঠাৎ পান রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। বাজারে পানের চল্লি (চল্লিশটি) ১০-১৫ টাকা। এর পর বর্ষায় বরজ ধ্বংস হয়ে গেছে। পানচাষির লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হবে। 
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন, এ উপজেলার ১৮ হেক্টর জমিতে সহস্রাধিক চাষি পান চাষ করেছেন। ভারী বর্ষণে পৌরসভা, নিজবটকাজল, বটকাজল, মদনপুরা, বিলবিলাস, মদনপুরা, ধুলিয়া, আদাবাড়িয়া কনকদিয়া এলাকার বরজ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের প্রণোদনা দেওয়া হয় না। তবে এবার তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠাবেন। 
পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ ড. আমানুল ইসলাম জানান, লাগাতার বৃষ্টিতে কৃষকের বেশ ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে রোপা আমনের বীজতলা, আউশ ধান ও শাকসবজির। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতির পরিমাণ ৯০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা হবে। দুয়েক দিনের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা করবেন। 

রাণীনগরে মাছের ক্ষতি বেশি
পানিতে নওগাঁর রাণীনগর ও আত্রাই উপজেলায় প্রায় ৮০০ বিঘা জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দুই উপজেলার বিভিন্ন পুকুর প্লাবিত হয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। এ ছাড়া ভারী বর্ষণে গ্রামীণ সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে।
রাণীনগর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম জানান, উপজেলায় ৪০০ বিঘা আমন বীজতলা, ১৬০ বিঘা রোপা আউশ ধানসহ মোট ৬১৫ বিঘা জমির ফসল বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। আত্রাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রসেনজিৎ কুমার জানান, বন্যার পানিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৬০ বিঘা আমন বীজতলা, ৪০ বিঘা আউশ ধানসহ মোট ১৩০ বিঘা জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 
রাণীনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, উপজেলায় প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আত্রাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৮ থেকে ১০টি স্থানে সড়ক ভেঙে গেছে। এ ছাড়া নদীতীরবর্তী এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
আত্রাই উপজেলার শ্রীধর গুড়নই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সামাদ জানান, সমসপাড়া থেকে আত্রাই যাওয়ার সড়ক ভেঙে যাওয়ায় ওই পথে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
রাণীনগর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ চন্দ্র দেবনাথ এবং আত্রাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাকসুদুর রহমান জানান, দুই উপজেলায় প্রায় ৬০টি পুকুর প্লাবিত হয়ে মাছ ভেসে গেছে। এতে মৎস্যচাষিদের প্রায় ৪৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×