বন্যার পানি কমলেও কাটেনি দুর্ভোগ, সাতকানিয়ায় ক্ষয়ক্ষতি ১২৬ কোটি টাকা
২৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত, পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে লাগবে ১৫ দিন
সাতকানিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়ক। ছবি: সমকাল
সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ | ১৮:১৪
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ইউনিয়নে সড়ক, কৃষিজমি, মাছের ঘের, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে আসছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে উপজেলার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১২৬ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়ক।
উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও শিক্ষা বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নলুয়া, আমিলাইষ, পশ্চিম ঢেমশা, চরতি, বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, এওচিয়া, সোনাকানিয়া, কাঞ্চনা, মাদার্শা, পুরানগড় ও খাগরিয়া ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল।
তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেন, বন্যার সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করতে আরও অন্তত ১৫ দিন সময় লাগবে। এখনো চূড়ান্ত হিসাব তৈরি হয়নি।
প্রাথমিক হিসাবে এলজিইডির আওতায় উপজেলার ৪০টি অভ্যন্তরীণ প্রধান সড়ক, পাঁচটি কালভার্ট ও একটি খালের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে, কোথাও কোথাও বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। কালভার্টের সংযোগ সড়ক ধসে পড়ায় কিছু এলাকায় মানুষ এখনো বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করে চলাচল করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৭০ হেক্টর আমনের বীজতলা, ১ হাজার ৯০ হেক্টর আউশ ধান, ৮৫০ হেক্টর শাকসবজি, ১২ হেক্টর পান, ২০ হেক্টর পেঁপে বাগান এবং ৩৫৫ হেক্টর মিশ্র ফলের বাগানসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১৬ হাজার ৫০০–এর বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা।
মৎস্য বিভাগের হিসাবে, বন্যায় ৩ হাজার ৫৭৫টি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৭৫ হেক্টর পুকুর ও দীঘি। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ১ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন মাছ ও ১৮ লাখ পোনা। অবকাঠামোসহ এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় আটটি গরু, ২৭টি ছাগল এবং দুই হাজারের বেশি হাঁস-মুরগি মারা গেছে। এ খাতে প্রাথমিক ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ১০ কোটি টাকা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, ৩৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২৫টি মাদ্রাসা এবং চারটি কলেজের ভবনের রং, দরজা-জানালা ও মেঝে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে তিন কোটির বেশি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
কেঁওচিয়া ইউনিয়নের সবজি চাষি আবদুল মোতালেব বলেন, বন্যার পানিতে তাদের কাঁকরোল, ঝিঙে, বেগুন ও ঢেঁড়সের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। চরতি ইউনিয়নের কৃষক হারাধন দাশ বলেন, তাদের ধানের বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। নতুন করে চাষাবাদ করতে হবে। সরকারি সহায়তা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
বাজালিয়া ইউনিয়নের মৎস্যচাষি আবদুল হান্নান বলেন, ঘেরের বাঁধ ভেঙে সব মাছ ভেসে গেছে। কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে সোনাকানিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, পানি নামলেও ঘরে এখনো কাদা। আসবাবপত্র ও খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে আবারও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রণোদনার প্রস্তাব পাঠানো হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, বিভিন্ন দপ্তর প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করেছে। কয়েকটি ইউনিয়নে এখনো পানি থাকায় চূড়ান্ত হিসাব করতে সময় লাগবে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, কৃষক ও মৎস্যচাষীদের সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।