চট্টগ্রামে বন্যার পানি কমছে
ভেসে উঠছে ক্ষত, এখনও অনেক পরিবার কাদাপানিতে
সাতকানিয়ায় প্রায় ১২৬ কোটি টাকার ক্ষতি
সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া ও এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামে টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতি ভেসে উঠছে। সাতকানিয়ায় সড়ক, কালভার্ট, কৃষিজমি, মাছের ঘের ও পুকুর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাজারো বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার এখনও কাদা-পানিতে বসবাস করছে। সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৩৭ কিলোমিটারের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে।
সাতকানিয়ার প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে, নলুয়া, আমিলাইষ, পশ্চিম ঢেমশা, চরতি, বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, এওচিয়া, ঢেমশা, সোনাকানিয়া, কাঞ্চনা, মাদার্শা, পুরানগড় ও খাগরিয়া ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে।
উপজেলা পরিষদে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রাথমিকভাবে ক্ষতির তালিকা তৈরি করেছে। এর মধ্যে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর বলেছেন, বন্যার সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তৈরি করতে তাদের আরও ১৫ দিন লাগবে।
বিভিন্ন দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য মতে, প্রাথমিক হিসাবে সব মিলিয়ে ১২৬ কোটি টাকা ও ২৫ কিলোমিটার সড়কের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ প্রধান ৪০টি সড়ক, ৫টি কালভার্ট ও একটি খালের বাঁধ ভেঙে অন্তত ১৫ কোটি টাকা এবং ২৫ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি খাতে ৭০ হেক্টর আমন বীজতলা, ১০৯০ হেক্টর আউশ, ৮৫০ হেক্টর শাকসবজি, ১২ হেক্টর পান, ২০ হেক্টর পেঁপে বাগান, ৩৫৫ হেক্টর জমির মিশ্র ফল এবং ১৬ হাজার ৫০০ এর অধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
মৎস্য খাতে ৩ হাজার ৫৭৫টি পুকুরের মাছ সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। ৫৭৫ হেক্টর পুকুর-দিঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৪৬০ টন মাছ এবং ১৮ লাখ পোনা ভেসে গেছে। অবকাঠামোসহ সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য মতে, ৮টি গরু, ২৭টি ছাগল ও ২ হাজারের অধিক হাঁস-মুরগি মারা গেছে। সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ১০ কোটি টাকা।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ৩৫টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ২৫টি মাদ্রাসা ও ৪টি সরকারি ও বেসরকারি কলেজের রং, দরজা-জানালা ও ফ্লোর নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ৩ কোটির অধিক ক্ষতি হয়েছে।
চরতি ইউনিয়নের দক্ষিণ চরতি এলাকার কৃষক হারাধন দাশ বলেন, ‘বন্যায় আমাদের ৫ হেক্টর জমির ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আবার নতুন করে চাষ করতে হবে। সরকারি সহযোগিতা না পেলে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।’
বাজালিয়া ইউনিয়নের মৎস্যচাষি আবদুল হান্নান বলেন, ‘ঘেরের বাঁধ ভেঙে সব মাছ বের হয়ে গেছে। কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন ঋণ কীভাবে শোধ করব, বুঝতে পারছি না।’
সোনাকানিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, ‘পানি নেমেছে, কিন্তু ঘরে এখনও কাদা। আসবাব, খাদ্যসামগ্রী ও কাপড়চোপড় নষ্ট হয়েছে। ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
ইউএনও খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। চূড়ান্ত করতে কিছু সময় লাগবে।
সীতাকুণ্ডে ৩৭ কিমি সড়কে ক্ষতি, ভোগান্তি
জেলার সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৩৭ কিলোমিটারের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন যাত্রী ও চালকরা।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, বাড়বকুণ্ডের ঢাকা ও চট্টগ্রামমুখী লেনে ২০০ গজের মধ্যে শতাধিক ছোট-বড় গর্ত। এক জায়গায় গর্তে লাঠিতে লাল পতাকা টানানো হয়েছে।
এ ছাড়া মহাসড়কের সলিমপুর, ভাটিয়ারী, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, বাড়বকুণ্ড, শুকলালহাট, বারআউলিয়া, ফকিরহাট, উপজেলা গেট, ছোট ও বড় দারোগারহাট এবং পৌর সদর বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন অংশে একই দৃশ্য দেখা গেছে। কোথাও কোথাও একাধিক গর্ত থাকায় যানবাহনকে গতি কমিয়ে চলতে হচ্ছে।
পণ্যবাহী ট্রাকচালক মো. ইব্রাহিম বলেন, ভারী বর্ষণের কারণে পানিতে গর্ত বোঝা যায় না। গাড়ি গর্তে পড়লেই বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। সময়মতো বন্দরে পণ্য পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের সীতাকুণ্ড উপসহকারী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, একটানা বৃষ্টির কারণে আগে করা সংস্কার টেকেনি। বৃষ্টি কমে আসায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশে বিটুমিন দিয়ে গর্ত ভরাট ও জরুরি মেরামত কাজ শুরু করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- চট্টগ্রাম