গ্রামের সড়কে বিকেলে বাজার সন্ধ্যা হলেই ‘বড়ির হাট’
সফুরউদ্দিন প্রভাত, আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে মাদকের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অভিযান চলছে। গ্রেপ্তার হচ্ছেন খুচরা কারবারিরা। উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক। কিন্তু কদিন বাদেই পাড়া মহল্লায় আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে নতুন কোনো চক্র।
উপজেলার রামচন্দ্রদী দক্ষিণপাড়া গ্রামে সড়কের পাশে প্রতিদিন বিকেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার বসে। সন্ধ্যার পর থেকেই দৃশ্যপট পাল্টে যায় এ বাজারের। এ সময় যুবক, কিশোর থেকে শুরু করে নারী মাদক বিক্রেতা পর্যন্ত রাস্তায় নেমে আসে। সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে তারা আওয়াজ দিতে থাকে ‘বাতের বড়ি লাগবোনি গো’ বলে। কেউ বলে- ‘দাঁত ব্যথার বড়ি আছে।’ কেউ বলে- ‘জ্বর-ঠাণ্ডা কাশির বড়ি লাগবোনি’। এই বড়ি (ট্যাবলট) হচ্ছে ইয়াবা।
বালিয়াপাড়ার পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি ঘিরেও সন্ধ্যার ভিন্ন এক পরিবেশ বিরাজ করে। দিনের বেলায় লোকজনের আনাগোনা থাকলেও সন্ধ্যার পরপরই সেখানে মাদক বিক্রেতা, মাদকসেবী ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল মোত্তালিব বলেন, জমিদার বাড়িটি পরিত্যক্ত থাকায় এটি এখন অসামাজিক কর্মকাণ্ডের নিরাপদস্থলে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর সাধারণ মানুষ ওই এলাকা এড়িয়ে চলেন।
বালিয়াপাড়ার বাসিন্দা মনির হোসেন জানান, মাদকের কারবার তরুণ সমাজকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পুলিশের অভিযানের পর কিছুদিনের জন্য মাদক বিক্রি কমে এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার আগের মতো শুরু হয়ে যায়। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
একই অবস্থা উৎরাপুর এলাকায় নির্মাণাধীন ওয়াসা সড়ক ও স্থানীয় একটি স্কুল মাঠ প্রাঙ্গণ। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন এসে এখান থেকে মাদক কিনে নিয়ে যায়। ওই এলাকার বাসিন্দা হোসেন মিয়া বলেন, মাঝে মধ্যেই পুলিশ অভিযান চালায়। কিছু মাদক কারবারিকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তারা জামিনে বের হয়ে আবার এই অপকর্মে জড়ায়।
এ রকম দৃশ্য শুধু রামচন্দ্রদী দক্ষিণপাড়ায়ই নয় গোপালদী, বিশনন্দী, চৈতনকান্দা, ব্রাহ্মন্দী, আড়াইহাজার সদর, পাঁচরুখী, পুরিন্দা, জাঙ্গালিয়া, উচিতপুরা ও কালাপাহাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়। এসব এলাকায় হাত বাড়ালেই মেলে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। এসব এলাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর নির্জন সড়ক, বাজারের পেছনের অংশ, নদীর তীর ও ফসলি জমিকে মাদক লেনদেনের নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে পুলিশের দাবি, রামচন্দ্রদীর দক্ষিণপাড়া এলাকা স্থানীয়দের সম্মিলিত উদ্যোগে মাদকের আগের অবস্থা আর নেই। মাদক কারবারিদের অবাধ বিচরণ একেবারেই কমে গেছে।
মাদকের ট্রানজিট রুট বিশনন্দী ফেরিঘাট
উপজেলার সীমান্তবর্তী বিশনন্দী ফেরিঘাট মাদক ও বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালানের নিরাপদ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। এ ফেরিঘাট দিয়ে যানবাহনে করে সড়কপথে এবং ট্রলার কিংবা স্পিডবোটযোগে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে মাদক ও ভারতীয় অবৈধ পণ্য পাচার হচ্ছে। গত এপ্রিল ও মে মাসে ৯২ কেজি গাঁজার কয়েকটি চালান জব্দ করে আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষা বাহিনী। এসব ঘটনায় দুই মাদক সরবরাহকারীকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতাদের গ্রেপ্তার তো দূরের কথা তাদের বিষয়ে কোনো তথ্যও জানাতে পারেনি পুলিশ। পুলিশ ও র্যাব মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে অবৈধ মালপত্র জব্দ ও সঙ্গে থাকা গাড়িচালক ও সহযোগীদের গ্রেপ্তার করলেও হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশ বলছে হোতাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে স্থানীয়রা বিশনন্দী ফেরিঘাটে একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প দাবি করছেন।
ফেরিঘাটের বিভিন্ন কাজে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার মাদক ও চোরাই পণ্য পাচার হয়ে থাকে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনই মূল পাচারকারী বা হোতাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
ছয় মাসে ৮৭ মামলায় গ্রেপ্তার ১১৯
পুলিশের তথ্যমতে, আড়াইহাজারে গত জুন পর্যন্ত ৬ মাসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ৮৭টি মামলা হয়েছে। এ সব মামলায় ১১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৩ মামলায় ১৭ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৬ মামলায় ৭ জন, মার্চ ১৪ মামলায় ২১ জন, এপ্রিল ১৪ মামলায় ১৯ জন এবং জুনে ১৯ মামলায় ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই সময়ে ৩ হাজার ৭১ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৮৫ কেজি ৩১০ গ্রাম গাঁজা, ১৬ পুরিয়া হেরোইন, সাড়ে চার লিটার চোলাই মদ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মোস্তাফিজুর রহমান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে নয়, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই মাদক নির্মূলে স্থায়ী সাফল্য অর্জন সম্ভব। এ ছাড়াও কেউ যদি মাদক কারবার ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে কাজ করতে চায় তাহলে মোস্তাফিজুর রহমান ফাউন্ডেশন থেকে তাঁকে আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে। ইতোমধ্যে দশ মাদক সেবী ও কাববারি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসায় ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে দশ লাখ টাকা আর্থিক সহযোগিতাসহ লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম আজাদ বলেন, আড়াইহাজারকে কোনোভাবেই মাদকের নিরাপদ রুট বা আশ্রয়স্থল হতে দেওয়া হবে না। যারা যুবসমাজকে ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তরুণদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় কার্যক্রম ও ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত করতে হবে।
আড়াইহাজার থানার ওসি সবজেল হোসেন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। তবে মাদক নির্মূলে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। নিয়মিত আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, মাদকের উৎস বন্ধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। মাদকের হোতাদের ধরতে না পারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাদক আইন অনুযায়ী যাদের কাছে মাদক পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তবে গ্রেপ্তারকৃতদের মোবাইল ফোন জব্দ করে তাদের সঙ্গে কাদের যোগাযোগ আছে তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- হাট-বাজার