ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খুবিতে অচলাবস্থা কাটেনি, প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটকে এখনও তালা

খুবিতে অচলাবস্থা কাটেনি, প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটকে এখনও তালা
×

ছবি: সমকাল

খুবি সংবাদদাতা

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০২:৪৯

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) বিজয় ’২৪ হলের নারী ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত অচলাবস্থা টানা তৃতীয় দিনেও কাটেনি। নারী শিক্ষার্থীদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের পাশাপাশি প্রধান ফটকেও তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। 

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটকে তালা ঝুলতে দেখা গেছে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাঁদের ঘোষিত বর্জন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে এবং দাবিগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।

এর আগে, গত ২২ জুলাই রাত প্রায় ৯টা ৪৫ মিনিটে বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের গোসলখানায় গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিও ধারণের অভিযোগে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত কর্মচারী ইমাম হাসানকে হাতেনাতে আটক করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। পরে তাঁকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। ঘটনার পরদিন ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার সকালে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ডাক দেন। 

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থতি মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত (রেজিস্ট্রার) অধ্যাপক ড. এস. এম. মাহবুবুর রহমান বাদী হয়ে অভিযুক্ত ইমাম হাসান ও তাঁর স্ত্রী রূপা মণির বিরুদ্ধে হরিণটানা থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর অভিযুক্তকে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে হল প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্তের পরিচালিত হল ক্যান্টিনের ইজারা বা বরাদ্দ তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে। হলের অভ্যন্তরে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া অপরাজিতা ও বিজয় ’২৪ ছাত্রী হলের ক্যান্টিন পরিচালনার জন্য নতুন পরিবেশবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভবিষ্যতে এই দুই ছাত্রী হলের ক্যান্টিনে কোনো পুরুষ কর্মী দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি তদারকি করছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে একাধিক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেসব সভায় শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে একাধিক কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, তদন্ত কমিটি গঠন, সংশ্লিষ্ট ক্যান্টিনের চুক্তি বাতিল, ছাত্রী হলে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ, ক্যান্টিন পরিচালনায় নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং ভবিষ্যতে ওই দুই ছাত্রী হলে কোনো পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পথে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় এবং ছাত্রী হলের ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটর আরও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভেন্টিলেটরে অসচ্ছ (নন-ট্রান্সপারেন্ট) গ্লাস স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের নিকৃষ্ট ঘটনার কোনো সুযোগ না থাকে। আমরা চাই শিক্ষার্থীরা হলে পুরোপুরি নিরাপদ ও স্বস্তিকর পরিবেশে বসবাস করুক। 

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তবে প্রশাসনিক ভবন সম্পূর্ণ তালাবদ্ধ থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের আন্তরিক অনুরোধ, প্রশাসনিক ভবনের তালা খুলে দিয়ে প্রশাসনকে স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দিন। এতে চলমান তদন্ত, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের অন্যান্য দাবিগুলো আরও দ্রুত কার্যকর করা সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। 

অন্যদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কেবল ব্যক্তিমাত্র অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়; পুরো ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির অভিযোগগুলোরও স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিত হাসান অর্ক বলেন, আমরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে আন্দোলন করছি না। আমাদের মূল দাবি হলো পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সামগ্রিকভাবে ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। প্রশাসন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠিকই, তবে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি না দেখা পর্যন্ত আমরা আমাদের অহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল আছি। 

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন তিথি বলেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর অনেক নারী শিক্ষার্থীর মধ্যেই চরম নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, শুধু এই একটি ঘটনার বিচার নয়; ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য একটি স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা করতে পারে। 

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত বা পরিস্থিতির পরিবর্তন সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ফলে প্রশাসনিক ভবন ও প্রধান ফটকে তালা, একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলন—সবকিছুই আগের মতোই বহাল রয়েছে।

আরও পড়ুন

×